ফরিদগঞ্জে ‘পর্তুগিজ দুর্গ’ নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পর্তুগীজ সেনাপতি ডি সিলভা
চাঁদপুরের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সারা বাংলাদেশ ঘুরে দেখার ভ্রমণের একটা পর্যায়ে আমি চাঁদপুর গিয়েছিলাম। পলিটিকালি কারেক্ট থাকার জন্য তখন ভয়ে স্বীকার করি নাই। কিন্তু এখন করবো।
এটা ছিল আমার দেখা সবচেয়ে “সাধারণ” জেলা। এর কোন বিশেষত্ব নাই। ঘুরে দেখার কোন জায়গা নেই। একদম মরুভূমি। এরকম চরম বিশেষত্বহীন হওয়াটাই একটা জেলার জন্য অস্বাভাবিক বিশেষত্ব।
বছর তিনেক আগে আমার স্কুলের চানপুইরা বন্ধু তার সব অ্যালামনাইকে চাঁদপুর ঘুরে দেখার নিমন্ত্রণ করলো। জানতাম চাঁদপুর ঘুরার নাম করে বুড়িগঙ্গা আর মেঘনা দেখাবে। পুরো ভ্রমণ বোরিং যাবে। কিন্তু যাওয়ার জন্য আমি এক পায়ে খাড়া। অ্যালামনাইরা জাহান্নামে ডাকলেও আমি যাব।যারা চাঁদপুরে যায়নি তাদের মধ্যে গবেষণা শুরু হয়ে গেলো। গিয়ে কী দেখবে, কই ঘুরবে ইত্যাদি খুঁজতে গিয়ে ইউটিউবে পাওয়া গেলো ইলিশ চত্বর, তিন নদীর মোহনা, স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ।
ইলিশ চত্বর মূলত টিন কেটে তৈরি করা একটা হাবাগোবা ইলিশের টু-ডি স্ট্যাচু। তিন নদীর মোহনা দেখার কিছু নেই, কারণ গত ৬ ঘন্টা আমরা নদীপথেই এসেছি। স্বাধীনতা চত্বরের পাশাপাশি দুটো সিমেন্টের তৈরি রক্তের ফোটাকে দেখে পুং অন্ডকোষের মত মনে হলো। শাকিলের উদ্যোগে এই রক্তের ফোটা দেখতে এসেছিলাম বলে সবাই একমত হলো, শাকিলের বলস দেখা হয়েছে। এবং সেটা সুখকর কিছু নয়।
অন দা স্পট সবাইকে হতাশ দেখে মাথায় আসলো প্রত্যেক জেলাতেই কোন না কোন জমিদার বাড়ি থাকে। খুঁজলে সবার বিরক্তি দূর হবে। গুগল করে আমরা দূরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা জমিদার বাড়ির দিকে রওনা হলাম। এটা একটা জীবিত জমিদার বাড়ি। মালিকরা মুসলমান হওয়ায় তারা দেশত্যাগ করেননি। বংশধররা এখনও সেই শান নিয়ে বেঁচে আছেন। ব্রিটিশ আমলের ভবনের ভিতরে সব ব্রিটিশ আমলের আসবাবপত্র। গত দেড়শো বছর ধরে এই ড্রয়িং রুমের সাজ পালটায়নি। পাশেই আছে জমিদারদের পরিত্যক্ত কোম্পানি আমলের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, পুরনো দুটি দিঘী। চাঁদপুর ভ্রমণ বৃথা গেলো না।
রাইসুল গুগল করে এক জায়গায় লেখা দেখতে পেলো – পর্তুগিজ দূর্গ। শুনে কান খাড়া হয়ে গেলো। দ্রুত দেখলাম। কিন্তু লোকেশনটা বিশ্বাসযোগ্য না। ফরিদগঞ্জ এর ভিতরে এমন অজপাড়াগাঁতে দূর্গ থাকবে, সেই দূর্গের আবার কোনদিন নাম শুনি নাই এমনটা হওয়ার চান্স কম৷ গুগল লোকেশনে কোন ছবিও দেওয়া নেই। স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে উপর থেকে দুর্গের কোন অবয়ব মনে হয় না। সাথের ক’জন বললো পুরোটাই ভুয়া। গুগোল ম্যাপে এরকম অনেক ভুয়া রাস্তা, ভুয়া লোকেশন থাকে। কিন্তু আমার আর রাইসুলের মনটা খচ খচ করতে থাকলো। সবাইকে নিয়ে জোর করে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের সেই লোকেশনে গেলাম। সবার আশঙ্কা সত্যি হলো। এখানে কোন দূর্গ নেই।
লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম। কেউ বলতে পারে না। তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে আবার বুঝলাম দূর্গ শব্দটার সাথে তারা পরিচিত না। প্রথমবার দূর্গ শব্দ শুনছে। ঘুরিয়ে বললাম কেল্লা, প্রাসাদ, জমিদার বাড়ি, পুরান বাড়ি। এবার এক কাঠমিস্ত্রী বুঝলো। সিএনজি চালককে বললো এরা মনে হয় সাহেবগঞ্জ যাইতে চায়। সামনে গিয়া ডাইনে নামায়া দেন।
সাহেবগঞ্জ নেমেই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। বিশাল এক দেয়াল। কমপক্ষে ৩৫ ফিট উঁচু। ইটের রকম মোঘলও না, ব্রিটিশও না। তবে ইউরোপিয়ান। দেয়ালের যা অবস্থা তাতে অন্তত ৩০০ বছরের কম হবে না। আমি আর রাইসুল প্রায় আকাশ থেকে পড়লাম যখন দেখি তার সাথেই ৪ তলা উঁচু একটা ওয়াচটাওয়ার আছে। মিনারের মত দেখতে ইন্দো ইউরোপীয় রীতির কারুকাজ করা ওয়াচ টাওয়ার। স্থাপত্যটা এতো প্রমিনেন্ট যে এটা নিয়ে আমরা কোনদিন কিছু শুনি নাই – এটাই সবচেয়ে অবাক করা বিষয়।
আমরা প্রথমে যে দেয়াল দেখছিলাম সেটা ঘুরে মনে হলো কোন বাণিজ্যকুঠি ছিল। নিচে সেলার। উপরে অফিস ছিল। ছাদ পড়ে গেছে। দেয়ালগুলোতে কামান রাখার ফুটো করা আছে। তার মানে আমরা যে রাস্তা দিয়ে আসলাম সেটা ছিল নদী। এখন নদীটা পশ্চিমে সরে গেছে। দেয়াল অনেক মোটা। মোঘলদের চাইতেও বেশি। ইটগুলো রোদে পোড়া।
ওয়াচ টাওয়ারে গিয়ে দেখি টাওয়ার অনেক মোটা হলেও উপরে ওঠার সিড়ি অনেক সরু আর সিড়িগুলো ক্ষয়ে গিয়ে স্লিপারের মত হয়ে গেছে। ওঠা শক্ত, তবে অসম্ভব না। আমরা উঠতে ইতস্তত করছিলাম। কয়েকজন মাদ্রাসার শিশু আমাদের পথ দেখিয়ে দিল – উপ্রে উঠন যায়। আহেন।
ওরা তিড়িং বিরিং করে উঠে গেল। আমরা অন্ধকারে সিড়িতে পা ফেলার স্টেপ খুজে পাই না৷ টাওয়ারের গম্বুজের তলায় ফুলের মোটিফ আঁকা৷ ৪০০ বছর আগেকার মোজাইক প্রায় অক্ষত। মোটিফে আইবেরীয়, আন্দালুসীয় স্থাপত্যশৈলী স্পষ্ট। পর্তুগিজ না হয়ে যায়ই না৷
মাদ্রাসার শিশুরা আমাদের জল্লাদখানায় নিয়ে গেলো। জল্লাদখানা হেঁটে গেলে ৫ মিনিট দূর। পথে আমরা বহু ভাঙা ঘর আর দেয়াল দেখলাম। জল্লাদখানায় সারি সারি ফাঁসির মঞ্চ। অন্তত ৮টা হবে। এর মানে এটা খুব বড় পর্তুগিজ সেটেলমেন্ট৷ একসাথে ৮টা ফাঁসিকাঠ কাদের প্রয়োজন! একদিনে শত শত ফাঁসি দেবার প্রয়োজন না হলে এতো মঞ্চের দরকার ছিল না৷ সম্ভবত পর্তুগিজদের চিরশত্রু আরাকান আর মুঘল যুদ্ধবন্দীদের মারতে অথবা নিরীহ গ্রামীণ বিদ্রোহ দমনে এগুলো কাজ করেছে৷
শিশুরা আমাদের হাতিশালায় নিয়ে গেলো। ৭-৮ মিনিট দূরে সেটা৷ হাতিশালাটা খুব বড়। ২০-৪০টা হাতি রাখার মত। তার চেয়ে বড় হলো ঘোড়াশাল। আমাদের সামনেই লোকজন হাতিশালার ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছে। দেখতে গেলাম কোথায় নেয়। পাশেই বাঙলাদেশের গরম আবহাওয়ায় ইউরোপিয়ান শীত নিবারণের উপযোগী “প্রবাসী টাইপের পাকা টাইলস বাড়ি” বানানো হচ্ছে। সেখানে দেয়াল তুলতে পর্তুগিজ দুর্গের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঘোড়াশালগুলো এখন অনেকের রান্নাঘর বা জ্বালানি রাখার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেগুলোরও ছাদ ধ্বসে গেছে বা ইট খুলে নিয়ে গেছে। এর বাইরে আছে জেলখানা, থাকার কোয়ার্টার, ব্যারাক, আর শত শত ভাঙা ঘর ও দেয়াল যেগুলো কী কাজে ব্যবহার হতো বোঝার উপায় নেই।
আমরা সিএনজি নিয়ে একটু চক্কর দিলাম। তাতে মনে হলো ৪০০ একরের কম হবে না। যদি আমার অনুমান ঠিক হয়ে থাকে তবে এটা দেশের বৃহত্তম দূর্গ। এটা দেশের একমাত্র মধ্যযুগীয় ওয়াচ টাওয়ার। অথচ চাঁদপুরবাসী বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জানেও না পরে ঢাকায় এসে আমি হিসাব করে বুঝেছিলাম, বিখ্যাত গবেষক ফ্রান্সিস বুকাননও ১৭৯৮ সালে এখানেই থাকতেন। উনার বাসা হিসেবে উনি যে পাতারচর উল্লেখ করেছিলেন সেটাই এখন চরপাতা গ্রাম। শুধু ডাকাতিয়া নদী শুকিয়ে পশ্চিমে সরে গেছে। এলাকার স্থাপত্য, নামকরণ দেখে বোঝা যায় এখানকার সেটেলমেন্ট কয়েক লেয়ারে হয়েছে। যেমন একটা মসজিদের নাম “হর্নি দুর্গাপুর দো’তলা মসজিদ”।
=> ইরফান শেখ (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)
এটা নিয়ে আমার অনুসিদ্ধান্ত হলো-
১. গ্রামের মানুষ এতো সরল, এমনভাবে তাদের শেকড়ের নামকে ধারণ করেছে যে মসজিদের নামে দুর্গা শব্দ যুক্ত করতে তাদের বাধেনি। তারা সরলমনে নিজ-গ্রাম দুর্গাপুরের নামেই মসজিদটা করেছে।
২. পয়েন্ট ১ ভেবে কোন সাম্প্রদায়িক শক্তির একদিন মনে হবে আয়হায় দুর্গাপুর মসজিদ নামটা তো ভালো না। দুর্গাপুর গ্রামটাও ভালো না। আগামী শুক্রবার বাদ জু’মআ সবাই আসবেন। আমরা মিলাদ পড়ে মসজিদের নাম রাখবো বায়তুল আমান ইনসানিয়া এহসানিয়া হাকিকি জামে মসজিদ। আর গ্রামের নাম হবে হজরতপুর।
৩. মসজিদটা এমন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছে যখন দোতলা মসজিদ করতে পারা একটা গৌরবের বিষয়। সম্ভবত লেট পাকিস্তান পিরিয়ড বা আর্লি বাঙলাদেশ পিরিয়ড।
৪. হর্নি দুর্গাপুর অর্থ হলো – এই গ্রামের আগের নাম হর্নিই ছিল। হর্নি কোন অস্ট্রো এশিয়াটিক শব্দ হবে বা মাগধী শব্দ। সেন আমলের শেষাশেষি ক্ষত্রিয়রা হিন্দুয়ানি করতে গিয়ে এই গ্রামের নাম দিয়েছে দুর্গাপুর। তবে মানুষের মুখে মুখে থাকায় আদি নাম হর্নি মুছে যায়নি।
হর্নি দুর্গাপুর দো’তলা মসজিদ – এই চার শব্দ দিয়ে গ্রামের ২০০০ বছরের ইতিহাস আর বিকাশ পড়ে ফেলা যায়৷
ডাকাতিয়া নদীর ডানদিকে মানে দুর্গের সাইডের গ্রামগুলোর নাম গৃদকালিন্দিয়া, উদমারা, বড়পাইকা, লাড়ুয়া, গোয়ালভাওড়, কাউনিয়া, রায়পুরা, শামদানপুর, নারায়ণপুর, সন্তোষপুর।
নদীর বাম দিকের গ্রামগুলো চরপাতা, বাইদ্যার চর, হাইমচর, হাওলাদার বাজার, রুস্তমপুর, চর ভৈরবী, আলগী, ইসলামিয়া বাজার।
নাম দেখে, গাছের ঘনত্ব দেখে, মাটির রকম দেখে এলাকাগুলো বোঝা যায়।
চাঁদপুরের সাহেবগঞ্জ পর্তুগিজ দুর্গটি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পর্তুগীজ সেনাপতি এন্টনিও ডি সিলভা মেনজিস। তিনি ১৫৪০ থেকে ৪৬ এর মধ্যে এই পর্তুগীজ দুর্গটি নির্মাণ করেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল মগদের নিয়ে বাঙলাদেশ লুট করা, মোঘল নৌবহর থেকে দূরে সেইফ হ্যাভেন প্রতিষ্ঠা করা, চাঁদপুর আর কুমিল্লা শাসন করা।
প্রায় জাহাঙ্গীরনগরের অর্ধেক, বাঙলাদেশের বৃহত্তম এই দুর্গ রক্ষায় চাঁদপুরের ভ্লগাররা কথা বলেন। চাঁদপুর সমিতিকে জানান। সারা চাঁদপুরের মধ্যে আপনাদের গর্ব করার মত যা কিছু আছে – এটা সবচেয়ে বড়। এটাকে বাঁচান।
আমি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে কথা বলেছি। তারা আমার একার কথা শুনবে না। একটা সামাজিক দাবি না উঠলে লোকজন আপনাদের দূর্গ খুলে নিয়ে যাবে, যাচ=> ইরফান শেখ (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)