এত প্রতারণা, তারপরও প্রবাসীদের ভরসা ইমো

হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি জেনেও সহজ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল অ্যাপ ইমো ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে পারছেন না প্রবাসীরা। অন্য অ্যাপের তুলনায় কম ব্যান্ডউইডথে সহজে ভিডিও ও ভয়েস কল করতে পারায় এখনো ইমো তাঁদের কাছে জনপ্রিয়। প্রবাসীদের অনেকে হ্যাকিংয়ের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তা ব্যবহার করছেন। কাতারপ্রবাসী অনেকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

১৫ বছর ধরে কাতারে বাস করছেন বাছির খান। কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। কিছুদিন আগে তাঁর ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়। হ্যাকাররা তাঁর খালাতো ভাই কাতারপ্রবাসী রবিউল ইসলাম বাবুকে মেসেজ দেয়, বাছির বিপদে পড়েছেন। তাঁর জরুরি ২০ হাজার টাকা দরকার। পরে তাঁর নম্বরে যোগাযোগ করে আর তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না।

বাবু টাকা পাঠানোর চেষ্টার মধ্যেই হ্যাকাররা বাছিরের খালার কাছে একই মেসেজ দেয়। একটি বিকাশ নম্বর দিয়ে তাতে পাঠানোর কথা বলা হয়। বাছিরের খালা তাৎক্ষণিক ওই নম্বরে ২০ হাজার টাকা পাঠান। কিছুক্ষণ পরে বাছির বুঝতে পারেন, তাঁর অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। তখন তিনি ফেসবুকে তাঁর অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে একটি পোস্ট দেন। এরপর পরিচিত আত্মীয়স্বজন সতর্ক হন।

এরপরও কেন ইমো ব্যবহার করছেন—জানতে চাইলে বাছির খান বলেন, আসলে ইমো অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ। তা ছাড়া কাতারে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে কল করে কথা বলা যায় না। কথা স্পষ্ট নয়। ছবিও আটকে যায়। দুটি অ্যাপের জন্য অনেক বেশি ডেটা খরচ হয়। তিনি বলেন, কাতারে এমনিতেই ইন্টারনেট খরচ অনেক বেশি। এখানে ১০০ রিয়াল বা প্রায় ৩ হাজার টাকায় ৭ জিবির সঙ্গে ২ জিবি বোনাসসহ ৯ জিবি ইন্টারনেট পাওয়া যায়। অথচ বাংলাদেশে মাত্র দেড় শ টাকায় সমপরিমাণ নেট সুবিধা পাওয়া যায়। দাম দিয়ে কেনা ইন্টারনেট হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে কল করে সঙ্গে প্রক্সি অ্যাপ ব্যবহার করে দ্বিগুণ ইন্টারনেট খরচ করা তাঁদের জন্য ব্যয়বহুল। তাই তাঁরা ঝুঁকি জেনেও ইমো অ্যাপস ব্যবহার করেন।

বাছির খানের খালাতো ভাই রবিউল ইসলাম বাবুও ইমো অ্যাপ ব্যবহার করেন। সবকিছু জেনেও তিনি খরচের কথা বিবেচনায় নিয়ে এটি ছাড়া অন্য অ্যাপ ব্যবহার করেন না। বলেন, দেশে প্রিয়জনদের সঙ্গে যখন-তখন ইমোতে সহজে কথা বলা যায়। অন্য কোনো অ্যাপে এটা সম্ভব নয়।

কাতার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোহাম্মদ সাইফের ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয় বলে জানান আরেক কাতারপ্রবাসী সোহেল আহমেদ। তিনি বলেন, সাইফের ইমো অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর কাছে মেসেজ আসে, তিনি বিপদে পড়েছেন, তাঁর কিছু টাকা দরকার। তিনি বলেন, এ মেসেজ পাওয়ার পর সন্দেহ হয়, সাইফ টাকার জন্য তাঁকে মেসেজ দেওয়ার কথা নয়। পরে সাইফের মোবাইলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, এ মেসেজ তিনি পাঠাননি। তাঁর মানে সাইফের ইমো অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছে।

আরও অনেক প্রবাসী জানান, তাঁদের ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে কোনো না কোনো সময়। অনেকে হ্যাকারদের ফাঁদে পা দিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছেন। তারপরও ঝুঁকি নিয়েই ইমো অ্যাপস ব্যবহার করেছেন এবং করছেন।

জানা যায়, কাতারে প্রায় সাড়ে চার লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। তাঁদের কম-বেশি সবার কাছেই ইমো অ্যাপসটি জনপ্রিয়। কল করার সঙ্গে সঙ্গেই সংযোগ পাওয়া যায়। ভয়েস ও ভিডিও কলে কথা বলতে কোনো বেগ পেতে হয় না। কম নেটওয়ার্কেও স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলা যায়। কাতারে অন্য যেকোনো অ্যাপে ব্যবহার আরও জটিল ও ব্যয়বহুল।

বাংলাদেশে একটি চক্র ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে প্রবাসীদের স্পর্শকাতর তথ্য-ছবি ও ভিডিও চুরি করে। এরপর তা দিয়ে ব্ল্যাকমেল করে প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বেশ কিছু ঘটনা এরই মধ্যে ধরা পড়েছে। এ চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পেছনের মূল হোতাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো তৎপর রয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

শুধু বাংলাদেশই নয়, কাতারেও একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় কাতারপ্রবাসীরা জানিয়েছেন। মূলত প্রবাসীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে, তাঁদের পরিবারের সদস্য বা প্রিয় বন্ধু ও স্বজনদের কাছেই হ্যাকাররা মেসেজ পাঠিয়ে থাকেন জানিয়ে প্রবাসীরা বলেন, এক-দুজন সাড়া দিলে তাতেই হ্যাকারদের লাভ।

Share