চাঁদপুর ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী তহিদ ইসলাম ওরফে অভিজিৎ কুরিকে ঘিরে ধর্ম পরিবর্তন করে প্রতারণা, একাধিক বিয়ে, তালাক ও একাধিক মামলার অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এক মুসলিম নারীকে বিবাহ করেন। তবে সেই দ্বিতীয় স্ত্রী, আহিয়া ইসলাম তামান্না, এখন তার বিরুদ্ধে যৌতুক ও ব্যভিচারের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় আরেক নারীর নামও ২য় আসামি হিসেবে উঠে এসেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এই ঘটনায়। মামলার নথি অনুযায়ী বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়াধীন।
জানা যায়, অভিজিৎ কুরি লক্ষ্মীপুর সদর জেলার বাঞ্চুনগর গ্রামের কার্তিক চন্দ্র কুরির ছেলে। কার্তিক চন্দ্র কুরি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। অভিজিতের প্রথম বিয়ে হয় রাণী মদকের সঙ্গে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর তারা ঢাকার উত্তরা এলাকায় বসবাস করতেন।
পরবর্তীতে অভিজিৎ কুরি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন আহিয়া ইসলাম তামান্না (২৬) নামের এক মুসলিম তরুণীকে। তামান্নার পিতা সেলিম হাওলাদার ও মাতা রাণী বেগম। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মূলাদি থানার চরডিক্রি গ্রামে। ঢাকায় তিনি মালিবাগ মোড়ে বসবাস করতেন।
মামলার নথি অনুযায়ী জানাযায়, ২০২৩ সালের ১০ মার্চ ঢাকার বাড্ডা এলাকায় কাজী মাওলানা সাঈদের মাধ্যমে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয় (বালাম বই নং ২১)। এই দাম্পত্য জীবনে তাদের দেড় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করে সেই মুসলিম তরুনীকে ভুলিয়ে বালিয়ে বিয়ে করলেও সে সংসার টেকেনি বেশিদিন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৮ মে তাদের মধ্যে তালাক কার্যকর হয়। তালাকের পর থেকেই পারিবারিক বিরোধ আইনি রূপ নেয় বলে দাবি ভুক্তভোগী পক্ষের।
বিয়ে ও পরকীয়ার নেশায়, কখনো হিন্দু কখনো মুসলিম ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ধর্ম নিয়ে প্রতারণা করা এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে রামপুরা থানায় ২০২৫ সালের ৩ জুন সিআর মামলা নং ২২৯/২০২৫ দায়ের করা হয়, যেখানে যৌতুক দাবির অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় তিনি গত ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে প্রথম জামিন মঞ্জুর করেন।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে একই বাদী তুরাগ থানায় দায়ের করেন একটি ব্যভিচার মামলা। মামলা নং ১৫১/২৫। এই মামলায় তহিদ ইসলাম ওরফে অভিজিৎ কুড়ির সঙ্গে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে নাম উঠে আসে তার তৃতীয় পরকীয়া সম্পর্ক থাকা প্রীতি কনা দাসের। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার জয়নগর-হলিমগঞ্জ গ্রামের সাতু রাম দাসের মেয়ে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
কয়েকটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, ব্যভিচার মামলার ২য় আসামী তার পরকীয়া প্রেমিকা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রায় সময়ই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোয়াটারে আসা যাওয়া করে থাকেন। যা অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে।
এছাড়া অভিজিৎ কুঁড়ি নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমু অ্যাপ ব্যবহার করে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেন এবং কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের আবেগগতভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো অভিযুক্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঢাকা আদালতে মামলা দায়েরের পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং চাঁদপুর ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৃথকভাবে দুটি অফিসিয়াল নোটিশ প্রদান করা হয়। তবে নোটিশ জারির পরও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে। দুটি মামলার আসামি হয়েও এবং লিখিত নোটিশ পাওয়ার পরও তিনি স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, যা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সচেতন মহলের।
একজন দায়িত্বশীল সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ধর্ম পরিবর্তন করে প্রতারণা, বিবাহ, দ্রুত বিচ্ছেদ এবং এরপর যৌতুক ও ব্যভিচারের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে তার পেশাগত অবস্থান এবং নৈতিকতার উপর প্রশ্ন তোলে। এসব অভিযোগ জনমনে বিদ্যুৎ বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বা উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত, এই গুরুতর অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে একটি বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা। অভিযুক্তের ব্যক্তিগত জীবন ও তার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে যেন কোনো সংঘাত সৃষ্টি না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া আবশ্যক।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রকৌশলী তহিদ ইসলাম ওরফে অভিজিৎ কুঁড়ির বক্তব্য চাইলে তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি। অনেক কথার পর তিনি বলেন, সব কিছুর জবাব আদালতে দেয়া আছে। আর এতেই প্রমানিত হয় তার বিরুদ্ধে যে আদালতে একটি যৌতিক মামলা এবং ওপর ব্যভিচার মামলা রয়েছে। আর সেই দুটি মামলার আসামী হয়েও তিনি বহাল তবিয়তে থেকে স্বাভাবিক ভাবে তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
প্রতিবেদক: কবির হোসেন মিজি/
১১ জানুয়ারি ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur