Home / উপজেলা সংবাদ / ফরিদগঞ্জ / প্রকৃত পীর-মাশায়েখ কখনোই ধর্মের অপব্যাখ্যা দেন না: ডিসি
পীর

প্রকৃত পীর-মাশায়েখ কখনোই ধর্মের অপব্যাখ্যা দেন না: ডিসি

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারী ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে ভোট প্রদান থেকে বিরত রয়েছেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এক পীরের ধর্মীয় অপব্যাখ্যার কারণে ১৯৬৯ সাল থেকে এ ইউনিয়নের অধিকাংশ নারী ভোটকেন্দ্রে যান না বলে জানা গেছে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও নারীদের ভোটকেন্দ্রে আনতে তেমন ফল পাওয়া যায়নি।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নারী ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে আবারও সক্রিয় হয়েছে জেলা প্রশাসন। 

এরই অংশ হিসেবে সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুরে ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের চরপক্ষিয়া গ্রামে নারী ভোটারদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে এবং গণভোট সম্পর্কে অবহিত করতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়ার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. রবিউল হাসান।

এছাড়াও সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শাহাজাহান মামুন, ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হেলাল উদ্দিন এবং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির। পরামর্শমূলক বক্তব্য দেন সময় টিভির স্টাফ রিপোর্টার ফারুক আহমদ ও স্থানীয় দৈনিক দিনকাল পত্রিকার প্রতিনিধি সোহেল খান। নারীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য খুকি বেগম, রুপালি দেবনাথসহ উপস্থিত কয়েকজন নারী ভোটার।

জানা গেছে, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১০ হাজার ২৯৯ জন। এ ইউনিয়নের নারীরা লেখাপড়া, হাটবাজার ও দৈনন্দিন নানা কাজে নিয়মিত ঘরের বাইরে গেলেও ভোটের দিন ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায়। নির্বাচনের দিন তারা ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে ঘরেই অবস্থান করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, “কোরআন ও হাদিসের আলোকে পর্দা রক্ষা করে নারীদের ভোট প্রদান করা ধর্মের সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়। প্রকৃত পীর-মাশায়েখ কখনোই ধর্মের অপব্যাখ্যা দেন না। পর্দা বজায় রেখেই সব ধরনের নাগরিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নারীদের সর্বোচ্চ পর্দা নিশ্চিত করা হবে। নারী ভোটারদের জন্য নারী ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, নারী নিরাপত্তাকর্মী এবং নারী স্বেচ্ছাসেবক থাকবে। পুরো ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় নারীরাই দায়িত্ব পালন করবেন।”

জেলা প্রশাসক বলেন, “ভোটকেন্দ্রে না এলে আপনারা গণভোটে অংশ নিতে পারবেন না। এতে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আপনাদের কোনো অংশীদারিত্ব থাকবে না।”

উল্লেখ্য, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন একটি প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। ফরিদগঞ্জ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে এই ইউনিয়নের প্রবাসীদের কাছ থেকে। পুরুষদের বড় একটি অংশ বিদেশে অবস্থান করায় হাটবাজারসহ প্রায় সব ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব নারীরাই পালন করে থাকেন। অথচ ভোটের সময় এ ইউনিয়নে ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায়।

গত প্রায় ছয় দশক ধরে এই ইউনিয়নের প্রায় সব ধর্মের নারীরাই ভোট প্রদান থেকে বিরত রয়েছেন। সর্বশেষ দুই-তিনটি নির্বাচনে কেবল প্রার্থীদের নিকটাত্মীয় কয়েকজন নারী ভোট দিয়েছেন, যা শতকরা হার হিসেবেও উল্লেখযোগ্য নয়।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারী ভোটাররা কি দীর্ঘদিনের জড়তা, ভয় ও কুসংস্কার কাটিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন? প্রশাসনের এই উদ্যোগ সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

প্রতিবেদক: শিমুল হাছান,
১২ জানুয়ারি ২০২৬