ফরিদগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত বরেণ্য সাংবাদিক মুহম্মদ শফিকুর রহমান

​বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ-৪ আসনের প্রাক্তন সংসদ সদস্য, দেশের বরেণ্য সাংবাদিক, বিশিষ্ট কলাম লেখক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

​সোমবার (২৬শে অক্টোবর) বাদ জোহর মরহুমের নিজ জন্মভূমি ফরিদগঞ্জের বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের বালিথুবা আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (গার্ড অব অনার) তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রধান করেন, ফরিদগঞ্জ সহকারী কমিশনার ভূমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান, ফরিদগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আল-আমিন তালুকদার সহ সংশ্লিষ্ট অফিসারবৃন্দ।

​পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (২৪শে অক্টোবর) বনানীর নিজ বাসভবনে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

​সোমবার বালিথুবা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজার পূর্বে মরহুমের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, চাঁদপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন ভূঁইয়া, বালিথুবা হামিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়ূন কবির তালুকদার, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ডাক্তার ওমর ফারুক, চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রহিম বাদশা, চান্দ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা এসএম হুজ্জাতুল্লাহ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক শাহাদাত হোসেন সাবু এবং মরহুমের পরিবারের সদস্যরা।

এ সময় বক্তারা বরেণ্য এই ব্যক্তিত্বের অসামান্য অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। জানাজার নামাজে ইমামতি ও দোয়া পরিচালনা করেন চান্দ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা এসএম হুজ্জাতুল্লাহ।

​উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মিয়াজী বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুহম্মদ শফিকুর রহমান। তাঁর পিতা মৌলভী আবদুল হামিদ এবং মাতা আয়েশা খাতুন। তিনি ফরিদগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৬৫ সালে কামিল (হাদিস) ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৭ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে ১৯৭০ সালে স্নাতক এবং ১৯৭১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

​ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতি ও প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি বীরত্বের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৯৭০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় তাঁর পেশাগত জীবনের সূচনা হয়। স্বাধীনতার পর ইত্তেফাকে পূর্ণাঙ্গ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দিয়ে দীর্ঘ ৩২ বছর স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র রিপোর্টার ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে ইত্তেফাক থেকে অবসর নেওয়ার পর স্বাধীন কলামিস্ট হিসেবে দৈনিক আজকের কাগজ, দৈনিক ভোরের কাগজ এবং দৈনিক জনকণ্ঠের জনপ্রিয় ‘চতুরঙ্গ’ পাতায় নিয়মিত কলাম লিখে জাতীয় পর্যায়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

​সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনে তিনি ১৯৮৫ সালে জাপানের টোকিও, ১৯৯১ সালে জার্মানির বার্লিন এবং যুক্তরাজ্যে উচ্চতর সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ ও পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। সাংবাদিক সমাজের শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে তিনি ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ মেয়াদে টানা দুবার বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। কর্মজীবনে তিনি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘সিটিজেন টিভি’র চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

​সাংবাদিকতার পাঠ চুকিয়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতেও সফল অবদান রাখেন। চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসন থেকে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালের ৩রা জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদে ফরিদগঞ্জের প্রতিনিধিত্ব করেন।

​মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, অসংখ্য সহকর্মী, গুণগ্রাহী এবং রাজনীতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের অজস্র শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর এই প্রয়াণে ফরিদগঞ্জের সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

প্রতিবেদক: ​শিমুল হাছান,
২৬ অক্টোবর ২০২৬