নিত্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ছড়াছড়ি, ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

টুথপেস্ট থেকে রান্নার তেল, দুধ, চিনি কিংবা দেশি মাছ—নিত্যদিনের খাবার ও ব্যবহার্য পণ্যের সঙ্গে অজান্তেই মানবদেহে ঢুকছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। দেশের বিভিন্ন গবেষণায় মাছ, দুধ, তেল, চিনি ও টুথপেস্টে এসব অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে এসব কণার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। এ অবস্থায় খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি নিরূপণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক গবেষণায় আড়িয়ল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি—এই পাঁচ ধরনের দেশি মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কই মাছে এর উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেল থেকেই বছরে গড়ে ৬,৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে, শিশুদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিইউপির যৌথ গবেষণায় খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে ৪৫ থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে ৪৪ থেকে ৫৪ হাজার কণা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে গবেষণা দলের প্রধান ড. শফি মুহাম্মদ তারেক এই মাত্রাকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

দুধেও মিলেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক। গবেষণায় প্যাকেটজাত দুধের প্রতি ১০ মিলিলিটারে গড়ে ১৫৬টি এবং কাঁচা দুধে প্রায় ৯৩টি কণা পাওয়া গেছে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুকের গবেষণায় দুধে টেফলন, পিইটি, নাইলন-৬ ও পিভিসির মতো বিভিন্ন পলিমার শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার সাত ধরনের চিনির নমুনা নিয়ে আরেক গবেষণায় ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের প্রধান উৎস হলো প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তার সংস্পর্শ, কারখানার যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ, প্লাস্টিকের গ্লাভস ও পরিবেশ দূষণ। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৮,০০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার অর্ধেকের বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। এসব বর্জ্য ভেঙে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে।

এর আগে ইএসডিওর গবেষণায় দেশের বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। শিশুদের ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেও এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন, যেখানে স্বাস্থ্য-পরিবেশ-বাণিজ্য সচিব, বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদকে বিবাদী করা হয়েছে।

বিএসটিআই জানিয়েছে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে সংস্থাটি বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মানবদেহেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, হৃদযন্ত্রের ধমনী, পেশি ও মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেনের এক গবেষণায় ডিমেনশিয়ায় মৃত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। আরেক গবেষণায় হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের ৮৪ শতাংশের রক্তে মাইক্রো-ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়; সুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩২ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, এই কণা রক্তনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হৃদরোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, অন্ত্রে প্রদাহ ও হজমের সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং হরমোনের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

গত রোববার রাতে গবেষণা দলের প্রধান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান আমার দেশকে বলেন, মাছের মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা উদ্বেগের কারণ।

আরেক গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র, চলনবিল, হাওড়াঞ্চল ও সমুদ্রের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সবচেয়ে বেশি শুঁটকিতে। অধ্যাপক শাহজাহান জানান, সমুদ্রে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দূষণ জমা হওয়ায় সেখানকার মাছেই এই মাত্রা তুলনামূলক বেশি।

তিনি বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশের পর কী ধরনের ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে দেশে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। তবে মাছের অন্ত্র ও মাংসপেশিতে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা বা ফাইবারের উপস্থিতি মানবস্বাস্থ্য ও জলজ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের অতিরিক্ত চিফ মেডিকেল অফিসার আব্দুল ওয়াদুদ (নাজিব ওয়াদুদ) আমার দেশকে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতির মাত্রা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এ নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা বেশি হয়নি। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের প্রায় সব তন্ত্র ও অঙ্গের ওপরই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

তার মতে, এসব কণা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে কোষের ক্ষতি করতে পারে। একই সঙ্গে রক্তনালির ক্ষতি, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি, হরমোনের ভারসাম্য ও কার্যকারিতা নষ্ট, পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি এবং স্নায়ুতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া প্রজননক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

সম্প্রতি এ বিষয়ক এক গণশুনানিতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক টুথপেস্টের পাশাপাশি খাবার-পানিতেও ছড়িয়ে পড়েছে, তাই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং সরকার জনস্বার্থে ব্যবস্থা নেবে। তবে স্কয়ার, প্রাণ-আরএফএল, নেসলেসহ শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা গণশুনানিতে দাবি করেন, গবেষণা প্রকাশের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা উচিত, নয়তো ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যে ব্যবসায়িক সুনাম অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হকও বলেন, গবেষণার ফল প্রকাশের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা হলে ভালো হতো।

দ্রুত ব্যবস্থা চায় ক্যাব

এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন আমার দেশকে বলেন, খাদ্যমান তদারকি সংস্থার গাফিলতি খতিয়ে দেখা এবং দূষিত পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি কমাতে প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মানবদেহে এর প্রভাব ও সহনীয় মাত্রা নির্ধারণে দ্রুত ও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন। সূত্র- আমার দেশ

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬