দেশে নারী ভোটার সাড়ে ৬ কোটি : প্রার্থী মাত্র ৬৫

১৯৯১ সাল থেকে গত ৩৫ বছরে সরকারের সর্বোচ্চ পদ প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিক নারী। অথচ দেশের রাজনীতিতে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়া নারীদের সংখ্যা এখনো হাতেগোনা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

১৯৯১ সাল থেকে গত ৩৫ বছরে সরকারের সর্বোচ্চ পদ প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিক নারী। অথচ দেশের রাজনীতিতে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়া নারীদের সংখ্যা এখনো হাতেগোনা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থীদের সংখ্যার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এ নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

নারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ার পরও রাজনীতির মূল মঞ্চে তাদের এই নগণ্য উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কঙ্কালসার চেহারাটিকেই উন্মোচিত করছে। তাদের মতে, পেশীশক্তি ও অর্থবলে পিছিয়ে থাকা, ধর্মীয়-সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, নারীদের রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রধান বাধা।

তাছাড়া পারিবারিক, সামাজিক কারণে এবং উ”চশিক্ষায় নারীর হার কম হওয়াও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শাসসুল আলম বলেন,রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণে পিছিয়ে পড়ার পেছনে উচ্চশিক্ষার হার কম ও ধর্মীয় পশ্চাৎপদ প্রথা দায়ী। নারীরা বাড়িতে কাজ করবে তারা রাজনীতি কেন করবে? এমন প্রশ্ন তুলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারও। আবার দেখা যায় ইউনিয়ন পরিষদে নারী নির্বাচিত হলেও পুরুষ সহকর্মীরা তাকে জায়গা দিচ্ছে না, বরাদ্দ কম দিচ্ছে। অনেক সময় নিপীড়নও করে। এখানে চলে পেশিশক্তির ব্যবহার। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোরও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে নারীদের এগিয়ে নেয়া খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে সবারই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ভোটে ক্রমশ কমছে নারীর অংশগ্রহণ: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ইসির তৈরি প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩০০ আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বৈধ মোট ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে পুরুষ প্রার্থী ১ হাজার ৭৭৭ জন। আর নারী প্রার্থী মাত্র ৬৫ জন অর্থাৎ মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে বৈধ মোট ১৮৯১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৯২ জন। শতাংশের হিসেবে যা ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৮৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিল ৬৯ জন। শতাংশের হিসেবে সেই নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিল ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ আগের দু’ নির্বাচনেরও চেয়েও কমেছে।

দলগুলোর সদিচ্ছার অভাব

নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী,আসন্ন নির্বাচনের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। অর্থাৎ দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ার পরও রাজনীতির মূল মঞ্চে তাদের উপস্থিতি খুবই নগণ্য।

এবারের নির্বাচনে ৫১ রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও নারী প্রার্থী দিয়েছে হাতেগোনো কয়েকটি দল। দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি থেকে ৯ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ৫ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে ৩ জন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ২ জন,গণসংহতি আন্দোলন থেকে ৪ জন,বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ থেকে ৩ জন,বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ মার্ক্সবাদী) থেকে ৮ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি থেকে ৬ জন,ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ৬ জন ও গণফোরাম থেকে ২ জন নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধতা ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি দলে একজন করে নারী প্রার্থী রয়েছেন।

এছাড়া সারা দেশে ৭ জন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন। সবমিলিয়ে এ সংখ্যা ৬৫ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধিত ৪৪ রাজনৈতিক দলের মধ্যে অংশ নিয়েছিল ২৭টি দল। ওই নির্বাচনে লড়াই করেন ৯২ জন নারী প্রার্থী। এর মধ্যে ১৪টি দলের ৬৮ নারী প্রার্থী ছিলেন। আর ২৬ জন নারী লড়েন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। সেই হিসেবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রায় ৫০% দলের কোনো নারী প্রার্থী ছিল না।

দলগত হিসাবে দেখা যায়,আওয়ামী লীগের ৩ শ ৬৩ প্রার্থীর ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ নারী প্রার্থী। জাতীয় পার্টির ২৬৪ প্রার্থীর ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ নারী প্রার্থী। স্বতন্ত্র ৩৮২ প্রার্থীর ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ নারী প্রার্থী।

সংসদে অংশগ্রহণ আরও কম

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী ৩৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন,১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে ৩৬ নারী প্রার্থীর মধ্যে ৮ জন,২০০১ সালের নির্বাচনে ৩৮ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ৬ জন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৫৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ১৮ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছিলেন সংসদ সদস্য হিসেবে। তবে,ওই সংসদে সংসদ সদস্য স্বামীর মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে তিনজন, স্বামীর ছেড়ে দেয়া আসনে ১ জন এবং প্রধানমন্ত্রীর ছেড়ে দেয়া আসনে একজন সহ ৫ জন নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আর ২০১৮ সালের অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ৬৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ২২ জন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৯২ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯ জন।

তিন বাধা দায়ী বলছেন বিশ্লেষকরা

বিশ্লেষকরা বলছেন,পেশিশক্তি, অর্থ ও ধর্মীয় পশ্চাৎপদ ধারণা, প্রধানত:এ তিন কারণে রাজনীতিতে নারীর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া পারিবারিক,সামাজিক কারণে এবং উচ্চশিক্ষায় নারীর হার কম হওয়াও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে নারী ঘরের বাইরে আসার ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে। নারী চাকরি করছে। নারী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনেও জড়িত আছে। কিন্তু রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, এটার জন্য আমাদের সমাজ এখনো তৈরি হয়নি।

রাজনীতি করতে পেশিশক্তি, নেটওয়ার্ক ও সার্বক্ষণিক সময় দিতে হয় উল্লেখ করে শান্তনু মজুমদার বলেন, এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর বহুদেশেই নারীরা সংগ্রাম করছেন। এই বাস্তবতায় একটা দল যখন নির্বাচনে প্রার্থী দেয় তখন জয়ী হবার মতো প্রার্থী খোঁজা হয়, সেখানে বুদ্ধিজীবী বা সামাজিক দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি খোঁজা হয় না। এই জায়গাতে এসে নারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝরে পড়ে।

সমাজকর্মী খুশি কবির বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে নারী প্রার্থী দেয়া সময় একদম নিখুঁত খোঁজেন। যার সব ধরনের যোগ্যতা থাকতে হবে,কোনো ক্রটি থাকা যাবে না। কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে তারা সেটা বিবেচনা করে না। অর্থাৎ নারীকে মনোনয়ন দেয়ার যেসব যোগ্যতা, দক্ষতা খোঁজা হয়,পুরুষের ক্ষেত্রে সেটা হয় না।

এটাও রাজনীতিতে নারীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ। দ্বিতীয়ত,এখন আমাদের যে ধরনের নির্বাচনি ব্যবস্থা রয়েছে,সেখানে যথেষ্ট লোকবল ও অর্থবিত্ত প্রধান। আগে যেমন প্রার্থীদের পাড়া-মহাল্লায় গিয়ে গণসংযোগের মাধ্যমে বোঝাতে হতো সে কেন আসছে,সে কেন ভোট চায়। এখন তো নির্বাচন হয়ে গেছে টাকার খেলা। যেটা নারীদের নেই। আর তৃতীয় হচ্ছে পেশিশক্তি,অর্থ এবং সহিংস পরিবেশ। এসব বাধা উৎরাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব নারীর প্রতি আরও উদার হতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

১১ জানুয়ারি ২০২৬
এ জি