Home / জাতীয় / গণতন্ত্রের নতুন সূচনা
sangsad-

গণতন্ত্রের নতুন সূচনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। নতুন সংসদে সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেশের আইন প্রণয়ন,নীতি নির্ধারণ ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য। অধিবেশনটি কেবল আইনসভা কার্যক্রমের সূচনা নয় বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার এবং সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সূচনামূলক কর্মকাণ্ড এ অধিবেশনের মূল আভিজাত্য বৃদ্ধি করেছে।

অধিবেশনের সূচনা ও প্রেক্ষাপট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন গতকাল অনুষ্ঠিত হয়। জোহরের নামাজের বিরতির পর পুনরায় অধিবেশন শুরু হয় এবং স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন। অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার দেশের জনগণের কাছে সংসদের গুরুত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে সংসদের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক। আমাদের দায়িত্ব হলো দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করা।’

নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

ত্রয়োদশ সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন। এই অধিবেশনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভোলা-৩ আসনের সাংসদ হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার নির্বাচিত হন। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল। স্পিকার নির্বাচনের জন্য প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করেন। হুইপ রাকিবুল ইসলাম প্রস্তাবকে সমর্থনকরেন। ডেপুটি স্পিকারের জন্য ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামালের নাম প্রস্তাবিত হয় এবং একমতভাবে সংসদ সদস্যরা তা অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ করান।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন মূলত সাংসদদের মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে সম্পন্ন হয়, যা সংসদের ঐক্য ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হাফিজ উদ্দিন আহমদ এর আগেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ও পানিসম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ -সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই মূলমন্ত্রে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজের বিরতির পর পুনরায় শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের জনগণ সবসময় গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সংসদই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রতীক। তাই সংসদের কার্যক্রমে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন,স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে দেশে স্বৈরশাসনের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে প্রতিবারই জনগণ সংগ্রামের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি সামপ্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেন। বিশেষ করে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে স্পিকার বলেন,সেই আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ ফ্যাসিবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।

স্পিকার আরও বলেন, দেশের মানুষ এখন সংসদের কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে আছে। জনগণ চায় সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হোক এবং দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখা হোক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

হট্টগোলের মধ্যেও রাষ্ট্রপতির ভাষণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো.সাহাবুদ্দিনের ভাষণ শুরু হলেও বিরোধী দলের প্রবল প্রতিবাদের কারণে মুহূর্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের আহ্বানে রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রবেশ করেন। এ সময় বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল,‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’,‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ করা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। স্পিকার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি স্পিকারের পাশে বসার পরই সংসদে হইচই শুরু হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ওয়াক আউট করেন। ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো.সাহাবুদ্দিন উল্লেখ করেন,গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও জুলাই শহীদদের স্মরণে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন,বর্তমান সরকার জনগণের কল্যাণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কৃষি খাতের উন্নয়ন নিয়ে তিনি সংসদে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করবে।

১৩৩ অধ্যাদেশ উপস্থাপন : প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করেন।

প্রতিবেদক : মো.নেয়ামত উল্যাহ
১৩ মার্চ ২০২৬
এ জি