শিক্ষাঙ্গন

দু’লাখ নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী আর্থিক অনুদান পাবেন

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় আড়াই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এ সময় সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পেলেও নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা কিছুই পাননি। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিসহ অন্যান্য খাত থেকে পাওয়া অর্থ থেকেই তাদের বেতন-ভাতা হয়ে থাকে। কিন্তু করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ রয়েছে। ঈদের বোনাসও হয়নি। এ অবস্থায় সারা দেশে প্রায় ২ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীকে এককালীন আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রস্তাবে দু’টি মত রেখে প্রধানমন্ত্রী বরাবর অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে টাকা ছাড় করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠির অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়েও গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষক ও কর্মচারীদের পাশে দাঁড়ানোর। এখন যেসব স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের এ নগদ প্রণোদনা দেয়া হবে, তারা সবাই নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের। পূর্বে এসব প্রতিষ্ঠান কোয়ালিফাইড বিবেচিত হয়নি বলেই এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। তারপরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে খুবই ভালো। আর কিছু মোটেও ভালো নয়। এজন্য সব মিলিয়ে একটা তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যেন প্রকৃত শিক্ষকরা এর আওতায় আসতে পারেন। একটি ডাটাবেজ তৈরির জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নম্বর চাওয়া হয়েছে।’

দীপু মনি স্বাক্ষরিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। অসহায় এ শিক্ষকদের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগী হয়ে এককালীন আর্থিক অনুদান দিতে দু’টি প্রস্তাব দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রস্তাবে স্কুল ও কলেজের জন্য আলাদা আলাদা থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষকদের জন্য ৮ হাজার অথবা ৫ হাজার এবং কর্মচারীদের জন্য ৪ হাজার অথবা আড়াই হাজার টাকা করে দুটি বিকল্প রেখে প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য প্রথমটিতে ব্যয় হবে ১২৬ কোটি টাকা আর দ্বিতীয়টিতে ব্যয় হবে ৭৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

প্রস্তাব অনুমোদনের পুরোপুরি এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এ কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এ পর্যন্ত অনেক ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও শ্রেণির মানুষকে সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ অবস্থায় প্রথম প্রস্তাবটি হয়তো অনুমোদন করা কঠিন হবে। কারণ সরকারের সামর্থ্যরেও একটা ব্যাপার আছে। সেটাও আমাদের বুঝতে হবে। এজন্য দ্বিতীয় প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে পারে বলে আমরা আশা করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবের অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়েও গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর অর্থ বিভাগের কাছে অর্থ ছাড়ের চিঠি দেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত চিঠি পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে অবশ্যই দ্রুততম সময়ে অর্থ ছাড় হবে।

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি পাওয়া নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৭ হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ২ লাখ ৫৪২ জন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়ে, প্রথম প্রস্তাবে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য এককালীন ৮ হাজার ও কর্মচারীদের জন্য ৪ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। এতে কলেজ পর্যায়ে ৮৪ হাজার ৮১৮ জন শিক্ষকের জন্য প্রায় ৩৯ কোটি ৫৪ লাখ ৪ হাজার টাকা এবং ৩৪ হাজার ৭৬২ জন কর্মচারীর জন্য প্রয়োজন ১৩ কোটি ৯০ লাখ ৮ হাজার টাকা।

স্কুল পর্যায়ে ৬৬ হাজার ৫০৭ জন শিক্ষকের জন্য প্রয়োজন ৫৩ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ৫০ হাজার ৪৫৫ জন কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজন ২০ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। প্রথম প্রস্তাবে মোট প্রয়োজন ১২৬ কোটি ৩৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য এককালীন ৫ হাজার এবং কর্মচারীদের জন্য ২ হাজার ৫ শ টাকা চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে ৭৮ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা লাগবে।

প্রস্তাবে এ টাকা চাওয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। টেকসই উন্নয়নের জন্য বিশ্বে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ২৭৩০টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্তির আওতায় এনে তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থবছরে এ বিশালসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্তির আওতায় নিয়ে আসায় তাদের মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে।

অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রায় ৭ হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা টিউশন ফি, অন্যান্য ফি এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। ঢাকাসহ বড় বড় শহরে কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে মফস্বল শহরে এবং গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সন্তোষজনক নয়।

ফলে দেশের বর্তমান এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা প্রচণ্ড আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। তাদের পেশাগত কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার কাছে সহযোগিতা নিতে পারছেন না। সরকারের দেওয়া কোনো সহায়তা কর্মসূচিতেও তারা অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন না। এ প্রেক্ষিতে সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের আনা প্রয়োজন।

২৩ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশিদ আমিন দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে নন-এমপিও স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্ধারিত ছকে তালিকা চেয়েছেন।

শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যাচাই করে ২৮ মে’র মধ্যে তালিকা পাঠাতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়। তথ্য চেয়ে পাঠানো নির্ধারিত ছকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বিকাশ,রকেট,নগদ ও শিওর ক্যাশের নম্বরও চাওয়া হয়েছে। এছাড়া নামের বানানসহ এনআইডি নম্বর চাওয়া হয়েছে।

ঢাকা ব্যুরো চীফ , ৩০ মে ২০২০
এজি

Share