তনুকে উৎসর্গ করে আবৃত্তি

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সম্পদশালী ব্যাক্তি এ্যাপল এর সত্ত্বাধিকারী স্টিভ জবস হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অন্তিম মুহূর্তে জীবনের মুল্যবোধ নিয়ে কিছু অসাধারণ কথা বলেছিলেন।
স্টিভ জবস এর জীবনের শেষ সময়কার সে কথাগুলো মানব বিবেককে ভীষণ ভবে নাড়া দেয়ার মতো। কথাগুলো আধারে জোছনার আলো ছড়ায়।
স্টিভ জবস বলেছেন- ‘বৈষয়িক যে কোন জিনিস হারালে আপনি পাবেন। কিন্তু একটা জিনিস হারালে আর পাওয়া যায়না, তা হলো মানুষের জীবন।’

শেষ মুহুর্তে তিনি জীবনকে দারুণ ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন মানুষে মানুষে ভালোবাসায় শান্তি নিহিত। তাইতো তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে- সম্পদ না খুঁজে ভালোবাসাও খোঁজে নিতে হয়। সম্পদ কভু শান্তি আনেনা। মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ আর ভালোবাসাই শান্তি আনে। পৃথিবীটাকে দেখো। শুধু সম্পদের পেছনে ছুঁটে হাহাকার করলে জীবনটাকে উপভোগ করতে পারবে না.. .. ..।’

তনুকে উৎসর্গ করা ‘আবৃত্তি ও শাস্ত্রীয় যন্ত্র সংগীত সন্ধ্যা’য় আবৃত্তিকার সাহিদুল সোহেলের কণ্ঠে শোনছিলাম স্টিভ জবস এর এসব অমীয় বাণী।
সোমবার নজরুল ইনস্টিটিউট কুমিল্লা কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত আবৃতি অঙ্গনে’র বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় এ আবৃত্তি ও শাস্ত্রীয় যন্ত্র সংগীত সন্ধ্যা।

‘ধ্রুপদ ঢেউয়ে শব্দের নাও’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী, নাট্যকর্মী নিহত সোহাগী জাহান তনুর স্মরণে।
চৌকস নাট্য সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় অংশুল আবৃত্তি কেন্দ্র, কুমিল্লা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এতে শাস্ত্রীয় যন্ত্র সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শ্রী-বাবুল কৃষ্ণ বিশ্বাস। আবৃত্তি করেন সাহিদুল সোহেল, ইউসুফ সাজন, সঞ্জয় শীল এবং ইলিয়াস সাগর।
আবৃত্তির সাথে শ্রী-বাবুল কৃষ্ণ বিশ্বাসের ধ্রুপদী যন্ত্রসংগীত এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা।

একে একে চার আবৃত্তি শিল্পীর পরিবেশনার মাঝখানে বাঁশিতে ইমন রাগ তুলেন বাবুল কৃষ্ণ। প্রায় বিশ মিনিটের ইমন রাগে যেন গোটা হলরুম জুড়ে নেমে আসে ধ্যন মগ্নতা।
এর পর পর্যায়ক্রমে আবৃত্তির ফাঁকে ফাঁকে বাবুল কৃষ্ণ বিশ্বাস পরিবেশন করেন সরোদ ও তবলা বাদন। সরোদে ঝংকার তুলেন বাবুল কৃষ্ণ। একুশ মিনিটের সরোদ পরিবেশনায় তিনি বাজিয়ে শোনান মালকোষ রাগ। বিমুহিত হয় দর্শক শ্রোতা।

অত:পর আবৃত্তি নিয়ে আসেন চার কণ্ঠ তাঁরকা।

আবৃত্তির রেশ না কাটতেই যেন সত্যিকার ‘ধ্রুপদ ঢেউ’ তুলেন বাবুল কৃষ্ণ। তবলার ত্রি-তালের লহরায় মন্ত্রমুগ্ধ হয় দর্শক-শ্রোতারা। আর তখনই খোঁজে পাওয়া যায় অনুষ্ঠানের নামকরণে স্বার্থকতা। মনে হলো সত্যিই বুঝি-
‘ধ্রুপদ ঢেউয়ের সাথে দিয়ে পাল্লা,
বেয়ে যাচ্ছেন শব্দের নাও, চার মাল্লা ’।

এবার ইউসুফ সাজন আবৃত্তি করেন হুমায়ুন আজাদের কবিতা ‘বিজ্ঞাপন বাংলাদেশ ১৯৮৬’-
‘যদি আপনার কোন মগজ না থাকে, শুধু পেশি থাকে,
যদি আপনার কোন হৃদপিন্ড না থাকে, শুধু লিঙ্গ থাকে।
তাহলে আপনি সেই পুরুষ, যাকে আমরা খোঁজছি !’

-হুমায়ুন আজাদের এই কবিতায় ফুটে ওঠে মানবতা হীন সমাজের প্রতিচ্ছবি।
ইউসুফ সাজনের পর সাহিদুল সোহেল আবৃত্তি করেন- তনু নামের একটি মেয়ে ছিলো।

আবৃত্তিকার সাহিদুল সোহেল তার স্বরচিত ‘তনু নামের একটি মেয়ে ছিলো’ কবিতায় তনুর মৃত্যু নিয়ে যে রাজনীতি চলছে তা’ই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তার আবৃত্তি করা কবিতার এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন-
‘বাকি সবারই জানা হয়ে গিয়েছিলো-
শুকুরের শায়েস্তা হবে না।
হায়নার দমন হবে না।
নেকড়ের বিনাশ হবে না।’

তনুর মৃত্যু রহস্য নিয়ে যে ধূ¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে এতে করে আমাদের নাগরিকদের আস্থা কোন দিকে যাচ্ছে, সাহিদুল সোহেল তা’ও জানান দিয়েছেন কবি শেখ সাদী (রহঃ) এর বয়ান আবৃত্তি করে-

‘যদি কেউ সত্যবাদী বলে প্রসিদ্ধি লাভ করে, তবে যদি কোন সময় ভুলও বলে, তখন লোকে তাকে ক্ষমা করে দেয়। আর যদি কেউ মিথ্যা বলে প্রসিদ্ধ হয়, তখন সত্য কথা বললেও কেউ বিশ্বাস করে না।’

কথাগুলো শোনতে শোনতে স্মৃতি পটে ভেসে এলো তনুর ছবি। হ্যা সেই তনু, কুমিল্লা সেনানীবাসে নির্যাতনের পর হত্যার করা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের ছাত্রী, নাট্য কর্মী সোহাগী জাহান তনুর ছবি। আর বার বার মনেপরে অনুষ্ঠান শুরুতেই সাহিদুল সোহেলের আবৃত্তি করা ধনাঢ্য স্টিভ জবস এর এসব অমীয় বানী- ‘ একটা জিনিস হারালে আর পাওয়া যায়না, তা হলো মানুষের জীবন।’ … …হৃদয়ে সবসময় ভালোবাসা রাখুন। নিজের জীবনটাকে ভালোবাসুন। ঠিক নিজের মতো করে অন্যকেও ভলোবাসুন।’

সঞ্জয় শীল, ইলিয়াস সাগর একে একে আবৃত্তি করেন- ‘অলৌকিক; কবির মৃত্যু; এই মৃত্যু উপত্যাকা আমার দেশ না।’

কুমিল্লা করেসপন্ডেন্ট : আপডেট ৩:০০ পিএম, ০৩ মে ২০১৬, মঙ্গলবার
ডিএইচ

Share