চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সাত সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে জিটুজি মেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে ১৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বলানি তেল ১০ হাজার ৮২৬ কোটি ১১ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হবে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) বাজেট ও ব্যাংক ঋণের অর্থ দিয়ে এই জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা জায়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে জিটুজি মেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দিয়েছে।
বিপিসি ২০২৬ সালের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়।
দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মেয়াদি চুক্তির আওতায় জি-টু-জি ভিত্তিতে নেগোসিয়েশন করে চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক, আরব আমিরাতের ইএনওসি, ভারতের আইওসিএল, থাইল্যান্ডের ওকিউটি, মালয়েশিয়ার পিটিএলসিএল এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের জন্য ১৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রিমিয়াম ও রেফারেন্স প্রাইসসহ ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৫২০ মার্কিন ডলারে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১০ হাজার ৮২৬ কোটি ১১ লাখ টাকা।
যে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে তার মধ্যে গ্যাস অয়েল ৮ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন, জেট এ-১: ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন, গ্যাসোলিন ১ লাখ মেট্রিক টন, ফার্নেস অয়েল ১ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন এবং মেরিন ফুয়েল ৩০ হাজার মেট্রিক টন রয়েছে।
বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আবুধাবির এডনক (আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি) থেকে ২০২৬ সালের জন্য ৭ লাখ মেট্রিক টন মারবান গ্রেডের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির প্রস্তাব আনে। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্যে বিপিসি জিটুজি ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জন্য ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব গত বছরের ৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়।
এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে লাইট ক্রড ৮ লাখ মেট্রিক টন এবং আবুধাবি হতে মারবান অয়েল ৭ লাখ মেট্রিক টন আমাদানি করা হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে আবুধাবির এডনক থেকে জিটুজি চুক্তি মোতাবেক মূল্য নির্ধারণ করে ২০২৬ সালের জন্য ৭ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) ৪৫ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫ হাজার ৫৪২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রতি ব্যারেলের গড় মূল্য ৮৪.২৯ মার্কিন ডলার। মারবানের ক্ষেত্রে ১ মেট্রিক টনে ৭.৬৫ ব্যারেল।
বৈঠকে জ্বালনি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আরেক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সৌদি আরবের সৌদি আরবিয়ান অয়েল কোম্পানি (আরামকো) থেকে ২০২৬ সালের জন্য ৮ লাখ মেট্রিক টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড (এএলসি) গ্রেডের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি।
সৌদি আরবের আরামকো থেকে জিটুজি চুক্তি মোতাবেক মূল্য নির্ধারণ করে ২০২৬ সালের জন্য ৮ লাখ মেট্রিক টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) ৫১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে মুদ্রায় এর পরিমাণ ৬ হাজার ৩২০ কোটি ২২ লাখ টাকা। প্রতি ব্যারেলের গড় মূল্য ৮৭.৫৩ মার্কিন ডলার। এরাবিয়ান লাইট ক্রুডের ক্ষেত্রে ১ মেট্রিক টনে ৭.৩৫ ব্যারেল।
রোজায় থাইল্যান্ড থেকে আসবে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার সয়াবিন
আসন্ন রমজান মাসে ভোজ্যতেলের কৃত্তিম সংকট ঠেকাতে আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) থাইল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার সয়াবিন তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। টিসিবির গুদাম পর্যন্ত পৌছাতে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম পড়বে ১৬২ টাকা ৬৩ পয়সা।
পাশাপাশি ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারী নিম্ন আয়ের পরিবারের নিকট ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে খরচ হবে ৭১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
বৈঠক সূত্রে জানা জায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল কেনার প্রস্তাব উপস্থান করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দিয়েছে।
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে ভোজ্য তেলের কৃত্তিম সংকট নিরসনে বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে জরুরি বিবেচনায় আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার সয়াবিন তেল কেনার জন্য থাইল্যাল্ডের প্রাইম কর্প ওয়ার্ল্ড কোম্পানি লিমিটেডের নিকট হতে দরপ্রস্তাব চাওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি দরপ্রস্তাব দাখিল করে।
টিইসি কর্তৃক দরপ্রস্তাবটি পরীক্ষা করে রেসপনসিভ হয়। দরপ্রস্তাবের সকল প্রক্রিয়া শেষে টিইসি নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে সুপারিশ করা প্রাইম কর্প ওয়ার্ল্ড কোম্পানি লিমিটেডের নিকট হতে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল ১৭৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৭ টাকায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুই লিটার পেট বোতলে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের মূল্য ধরা হয়েছে ১৩১ টাকা ৪৭ পয়সা। টিসিবির গুদাম পর্যন্ত অন্যান্য খরচসহ প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের মূল্য হবে ১৬২ টাকা ৬৩ পয়সা। এই তেল খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য। এতে সরকারের কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণলায়ের আরেক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল (৫০ কেজি বস্তায়) কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৭১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারী নিম্ন আয়ের পরিবারের নিকট ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার জন্য স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে ৫টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। তার মধ্যে ৪টি দরপ্রস্তাব কারিগরিভাবে ও আর্থিকভাবে রেসপনসিভ বিবেচিত হয়।
দরপ্রস্তাবের সব প্রক্রিয়া শেষে টিইসির সুপারিশে রেসপনসিভ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের এম/এস পায়েল অটোমেটিক ফুড প্রসেসিং মিলসের নিকট থেকে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল প্রতি কেজি ৭১ টাকা ৮৭ পয়সা হিসেবে মোট ৭১ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ক্রয় কমিটির বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঢাকার সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস লিমিটেড থেকে ১৮০ টাকা ৮৫ পয়সা দরে এক কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল কেনার একটি প্রস্তাব নিয়ে আসা হয়। তবে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
সৌদি আরব থেকে আমদানি হবে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া
চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১৯১ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর মাধ্যমে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কেনার প্রস্তাব নিয়ে আসা হয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেয়।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং আপদকালীন ও জরুরি পরিস্থিতি এবং দেশীয় কারখানায় সারের ঘাটতি মোকাবিলায় আরও ৩ লাখ মেট্রিক টনসহ মোট ৬ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির চুক্তি করা হয়।
এই চুক্তি মোতাবেক সারের মূল্য নির্ধারণ করে প্রতি মেট্রিক টন ৩৯০ মার্কিন ডলার হিসেবে ৪০ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার ১ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলারে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৯১ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইউরিয়া সার কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ লাখ মেট্রিক টন। তার মধ্যে সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
৬ জানুয়ারি ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur