৪ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা সেবায় রয়েছে মাত্র ৪ চিকিৎসক

চরাঞ্চল সমৃদ্ধ চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষের প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালটি এখনো ৩১ শয্যা বিশিষ্ট রয়ে গেছে। হাসপাতালটিতে রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাব। উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা সেবায় রয়েছে মাত্র ৪ চিকিৎসক।

২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালে ১৬ বছরের ১৪ বছরই ছিলেন না গাইনি ও সার্জারি চিকিৎসক। চিকিৎসক ও অন্যান্য স্টাফ স্বল্পতা এবং সরঞ্জামাদির অভাবে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।

হাসপাতালটির জন্য বরাদ্দকৃত ১০টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন চিকিৎসক। হাসপাতালে ব্যবহৃত যন্ত্রাদি অনেক বছর ধরে প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে (এনালগ) মেশিনটিও অকার্যকর। এক্স-রে মেশিন পরিচালনার ট্যাকনিশিয়ানের পদটিও রয়েছে শূন্য। নির্ধারিত ১টি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও প্রায়ই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারের পদটিও শূন্য। হাসপাতালটিতে নেই পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্টও। টেকনোলজিস্টের ৪টি পদ থাকলেও দীর্ঘদিন যাবত ৩টি পদই শূন্য রয়েছে। মাত্র ১ জন টেকনোলজিস্ট দিয়ে এই ৫০ শয্যা হাসপাতাল পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

হাসপাতালের যন্ত্রাদি নষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে ফলে চিকিৎসা খরচ কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালে বরাদ্দকৃত ১০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ৪ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। এখানে নেই জুনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, জুনিয়র কনসালটেন্ট এনিসথেসিয়া, জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, জুনিয়র কনসালটেন্ট ডেন্টাল। হাসপাতালে ৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ বরাদ্দ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। ৩টি পদই এখন ফাঁকা। ফলে হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার এই দুরবস্থায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন উপজেলা ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ’ কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী।

তবে উপজেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা একজন চিকিৎসক হলেও হাসপাতালে তিনি মূলত প্রশাসনিক দায়িত্বটাই পালন করেন। হাসপাতালে ৪ জন চিকিৎসকের মধ্যে আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে সার্বক্ষণিকভাবে এই হাসপাতাল ক্যাম্পাসে থাকার কথা থাকলেও এই হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মিজানুর রহমান থাকেন নোয়াখালীতে। তিনি সপ্তাহের ৫ দিন নোয়াখালী থেকে এসে অফিস করেন আবার প্রতিদিনই চলে যান। সপ্তাহে ৫ দিনের কোনো কোনো দিন আবার আসেনও না।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গেইটের কাছের এক ফার্মেসির স্টাফের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, মানুষ না জানার কারণে অনেক সময় প্রসূতি মায়েদের (সিজারিয়ান/নরমাল) ডেলিভারির জন্য এই হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সেই প্রসূতি মায়েদেরকে নিয়ে আবার অন্যত্র ছুটে যেতে হয়। এমনিতেই স্থানীয় রাস্তা-ঘাট ভাঙাচোরা, তার ওপর প্রসূতি মায়েদের নিয়ে ছুটোছুটি এসবের কারণে রোগীর সঙ্গে আসা লোকজন মারাত্মক বিরক্তি প্রকাশ ও কখনো কখনো গালমন্দ করতে করতে ফিরে যেতে দেখা যায় ।

উপজেলার লামছড়ি এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আমরা বিনা পইসায় এনো (এখানে) ডাক্তর দেহাইতে আই কিন্তু সব ডাক্তরও পাইনা, আগের মতন অষুধ-বড়িও পাইনা। ডাক্তর সাব এপ্সো (এক্স-রে) করাইতে দিছে হুনি এপ্সোও নাকি এনো করান যাইত না। কনতো (বলেন তো) এই হাসপাতাল নাকি গরীবের হাসপাতাল!’

জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ঘাটতির বিষয়ে কথা হলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি হাসপাতালটির পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। হাসপাতালের চিকিৎসার মান উন্নত করতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।’

আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে সার্বক্ষণই হাসপাতাল ক্যাম্পাসে থাকার কথা কিন্তু তিনি একদমই থাকছেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ডা. মাহবুবুর রহমানের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি খুবই হালকাভাবে উড়িয়ে দেন।

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
২০ জানুয়ারি ২০২৬