চাঁদপুরে মা ইলিশ ধরলে ৬ মাসের কারাদণ্ড, বাতিল হবে জেলে কার্ড
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেছেন, ইলিশ সম্পদ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকার করলে সংশ্লিষ্ট জেলেদের কমপক্ষে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাদের জেলে কার্ড বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নদীসংলগ্ন খালের মুখ বন্ধ করা এবং অভয়াশ্রম এলাকায় পাঁচটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা মৎস্য দপ্তর আয়োজিত মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৬ উপলক্ষে ইলিশ সম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, যেসব জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে নামবেন না এবং মা ইলিশ শিকার থেকে বিরত থাকবেন, তাদের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে। চাঁদপুর জেলায় এ সহায়তা পাবেন ৪১ হাজার ৩৯০ জন জেলে। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যাতে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপে না পড়েন, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মেঘনা উপকূলীয় এলাকার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে হবে। ‘ইলিশের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা জরুরি। টাস্কফোর্সের সঙ্গে অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয় থাকলে অভিযান সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
এ সময় চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাকে কেন্দ্র করে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে। এ অভয়াশ্রমে মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ড সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
সভায় অভয়াশ্রম এলাকায় মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন বরফকল বন্ধ রাখা হবে। এ সময় নদীতে কোনো ধরনের ড্রেজার মেশিন চলতে দেওয়া হবে না। চাঁদপুরের বাইরে থেকে জেলেরা এসে যাতে নদীতে মাছ ধরতে না পারেন, সে বিষয়েও বিশেষ নজরদারি থাকবে। গত বছরও বহিরাগত জেলেদের মাছ ধরা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এবারও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, অভয়াশ্রম এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ৮ থেকে ৯টি খালের মুখ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে অবৈধভাবে মাছ ধরার সুযোগ কমবে এবং অভিযান বাস্তবায়ন সহজ হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেলা পুলিশের উদ্যোগে চেকপোস্ট বসানো হবে। অভিযান পরিচালনার সময় কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত থাকবে।
সভায় মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে বক্তব্য দেন নৌ পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উজালা রানী চাকমা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. খায়রুল কবীর, কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার লে. কমান্ডার মুহতাছিন ইসলাম এবং সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন হাইমচর উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবু রহমান, জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি গোলাম মোস্তফা এবং জেলেদের পক্ষে শহরের টিলাবাড়ি এলাকার জেলে মো. জাহিদ হোসেন ও আব্দুল বারেক।
সভায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, জেলেদের খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করা, নদীপথে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি জেলেদের জীবিকা ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি এবং জেলেদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারের অভিযান সফল হবে এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
প্রতিবেদক: আশিক বিন রহিম/
১ অক্টোবর ২০২৬