চাঁদপুরে চা শ্রমিক গণহত্যার একশ বছর আজ

পৃথিবীর জঘণ্যতম গণহত্যাগুলোর অন্যতম ‘চাঁদপুর চা শ্রমিক গণহত্যা’। ‘পৃথিবীর ইতিহাসের মির্মমতম এই শ্রমিক গণহত্যার একশ বছরেও চাঁদপুরে কোনো স্মৃতিচিহ্ন কিংবা ভাষ্কর্য স্থাপন করা হয়নি’

শ্রমিক ইতিহাসের নির্মম এই হত্যাযজ্ঞটি সংঘঠিত আজ থেকে একশ বছর আগে, ১৯২১ সালের ২০মে। সেদিন নিজ দেশে ফিরে যেতে সিলেট থেকে ১৭ দিন পায়ে হেঁটে চাঁদপুরে আসা অভুক্ত, ক্লান্ত আর নিরস্ত্র চা শ্রমিককে হত্যা করেছিলো আসাম রাইফেলসের গোর্খা বাহিনী। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে হত্যা শেষে তাদের পেট কেটে ফেলে দেয়া দিয়েছিলো চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনায়।

যাতে করে বিপুল সংখ্যক এই লাশের মিছিল পানিতে ভেসে না উঠে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই গণহত্যার কথা প্রকাশ না পায়। সেদিন এই নীরব গণহত্যায় কতজন চা শ্রমিক প্রাণ হারায় কিংবা কতজন আহত শ্রমিক নদীর স্রোতে নিখোঁজ হয়েছিলো, সে হিসেবও করতে দেয়নি ব্রিটিশ শাসকরা।

তবে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন সূত্রের দাবী এই গণহত্যায় মৃত্যের সংখ্যা ৭ হাজার থেকে ১৫ হাজার। এ হত্যাযজ্ঞ ১৮৮৬ সালের ৫ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে ‘হে’ মার্কেটে শ্রমিক হত্যার ঘটনাকেও হার মানায়।

ইতিহাসের এই কালো দিনটিকে স্মরণে এবং এই মৃত্যুঞ্জয়ী ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে চা শ্রমিক আন্দোলনকে বেগবান করতে ২০০৮ সাল থেকে ২০ মে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন।

কিন্তু অপ্রিয় হলেও একথা সত্য যে, এই পৈশাচিক গণহত্যাটি আজও নিপিড়িত চা শ্রমিকদের উপর সংঘঠিত হওয়ায় এবং তারা এদেশের নাগরিক না হওয়ায়, এ নিয়ে অন্য কোন জনগোষ্ঠীর তেমন কোন ভাবনা নেই। ফলে ধীরে ধীরে নির্মম-নির্দয় ঘটনাটি সময়ের চাকায় চাপা পড়ে যাচ্ছে। যার আরেকটি কারণ হতে পারে, শত বছর পরেও চা শ্রমিকরা সেই বৃটিশ ঔপনিবেশিক জাল ছিন্ন করতে পারেনি। অথবা এ যুগের শোষকশ্রেণী সে জাল ছিন্ন করতে দেয়নি। ফলে ব্রিটিশদের ধোঁকা, দারিদ্রতার তাড়া আর ভালো থাকার লোভে তাদের পূর্বপুরুষেরা সেই যে চা বাগানে প্রবেশ করেছিলো- উত্তরাধিকার হিসেবে সে বোঝা আজও তারা বয়ে বেড়াচ্ছে।

আধুনিক বিশ্বের সুখবিলাসি মানুষের উন্নত যাপন দেখা চা শ্রমিকরা এখনো সেই মধ্যযুগীয় দাস প্রথার জালে আটকে আছে। তবে পূর্বপুরুষদের রক্তে রঞ্জিত সেদিনের সেই ‘মুল্লুকে চলো আন্দোলন’ চা শ্রমিকদের সাহস যোগাচ্ছে। যে সাহস নিয়ে আজো তারা অধিকার আদায়ের লড়াই করে যাচ্ছে। হয়তো একদিন তারা সফল হবে।

এ পর্যায়ে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, চাঁদপুর অঞ্চলের সাথে চা শ্রমিকদের সম্পর্ক থাকার তো কথা না। কারণ চাঁদপুর যেহুতু পাহাড়ি অঞ্চল নয়, আর এখানে যেহুতু চায়ের চাষ হয় না, কিংবা এখানে চা চাষীদের ভিটেমাটিও ছিলো না। তবে কেনো চা শ্রমিকদের উপর এই হত্যাকাণ্ডটি চাঁদপুরর সংঘটিত হলো? আর চা শ্রমিকরা কেনই বা নিজের দেশ ছেড়ে এদেশে এলো। সে প্রশ্নের নির্মম উত্তর খুঁজতে আমাদের আরো একটু পেছনে যেতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে চা উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কর্মক্ষম চা বাগানসহ ১৬৭টি বানিজ্যিক চা এস্টেট রয়েছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঠিক কবে থেকে চা পানের প্রচলন চালু হয়েছিলো তা নিয়ে ঢের বতর্ক রয়েছে। একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতকে চীনের ইউন্নান প্রদেশে চা পানের প্রচলন শুরু হয়। তখন চীন ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও চায়ের প্রচলন ছিল না। আঠারোশো শকতে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে চা চাষের সূচনা করে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মানিলাছড়ায় চা বাগান স্থাপন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী।

তখন বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনে বিপুল শ্রমিকের চাহিদা দেখা দেয়। তখন ব্রিটিশ সরকার সস্তায় শ্রম কিনতে বেছে নেয় অভিনব প্রতারণার পথ। তারা ভারতের দরিদ্র এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত সাঁওতাল, কুর্মী, মুন্ডা, কুলবিল, লোহার ইত্যাদি আদিবাসী গোষ্ঠী এবং উড়িষ্যা, বিহার, মাদ্রাজ, মধ্য প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ, বাকুড়া অঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দালালদের মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমিক সংগ্রহ করে। তাদের কমিশনপ্রাপ্ত দালালরা অসহায় গরীব চাষিদের প্রলুব্ধ করতে ‘মাটি খুঁড়লেই সোনা পাওয়া যায়’ বা ‘গাছ নাড়ালে টাকা পড়ে’ এ রকম মিথ্যে প্রলোভন দেখায়।

শ্রমিকদের এখানে এনে প্রথমে গাছ কেটে পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করতে বলা হয়। কিন্তু ‘বৃক্ষ হত্যা পাপ’ দাবী করে তাদের কেউ কেউ গাছ কাটতে অনীহা প্রকাশ করে। তখন দালালরা বলে ‘গাছ লাগায়ে গা তো পয়সা মিলেগা’।

এভাবেই মালিক পক্ষের লোকেরা একে পর এক মিথ্যে আশা আর প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমিকদের পাহাড়ের জঙ্গল পরিস্কার করে চা গাছ লাগাতে বাধ্য করে। কিন্তু তাদের কোনরকম স্থায়ী আবাস ভূমি কিংবা নাগরিক সুবিধা দেয়া হয়নি। উল্টো তাদের সাথে মধ্যযুগীয় দাস শ্রমিকদের মত আচড়ণ শুরু করে মালিক পক্ষ। নামমাত্র মজরুরী, উদয়াস্ত পরিশ্রম, রোগ-বালাই এমনকি পাহাড়ের জন্তু জানোয়ারের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার পাশাপাশি বাগানমালিকদের নিপীড়ন নির্যাতনে শ্রমিকরা অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

আসাম লেবার এনকোয়েরি কমিটির এক প্রতিবেদন দেখা যায়, ১৯১৭-২০ সময়কালে লক্ষাধিক চা শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে। ফলে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের মাঝে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ, দেখা দেয় বিদ্রোহ। কন্তু নেতৃত্ব না থাকায় সে বিদ্রোহ প্রাণ পাচ্ছিলো না।

এদিকে ওই সময়টাতে ভারতবর্ষজুড়ে খেলাফত আন্দোলন আর অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ বইছে। জীবন বাজি রেখে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনরত মহাত্মা গান্ধীর অনুসারীরা। সে আন্দোলন দোলা দেয় চা শ্রমিকদের। অবশেষে এই অমানবিক জীযন-যাপন ছেড়ে তারা নিজ জন্মস্থানে ফিরে যাবার মনস্থির করে।

১৯২১ সালের মে মাসে চা শ্রমিক নেতা পণ্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত ও পণ্ডিত দেওসরন এর নেতৃত্বে ‘মুল্লুকে চল’ আন্দোলনের ডাক দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু বাগানমালিকের যোগসাজশে ব্রিটিশ সরকার রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। উপায় না দেখে প্রায় ৩০ হাজার চা শ্রমিক রেললাইন ধরেই হাঁটতে শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য চাঁদপুর স্টিমারঘাট। তাদের ধারনা চাঁদপুর ঘাটে পৌঁছলেই স্টিমারে চেপে নিজ জন্মভূমিকে যাওয়া যাবে। মে মাসের ৩ তারিখ শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘‘মুল্লুকে চল’’ অভিযান।

দীর্ঘ এ অভিযাত্রায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নির্দেশে চা শ্রমিকদের পাশে ছিলেন কংগ্রেস নেতা যথীন্দ্র মোহন সেন, হরদয়াল নাগ। ১৭ দিনের এই দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে ২০ মে চাঁদপুর স্টিমার ঘাটে পৌঁছে শ্রমিকরা। পথে পথে অনহারে বহু শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। এই বিপুল সংখ্যক অভুক্ত আর ক্লান্ত শ্রমিকদের পাশে দাোড়ান চাঁদপুরের মহত্মা গান্ধি নামে পরিচিত সর্বভারতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য্য হরদয়াল নাগ। তিনি স্থানীয়দের সহায়তায় চা শ্রমিকদের চিড়া-মিঠাইসহ শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেন।

এদিকে বিট্রিশ সরকারের নির্দেশে স্থানীয় কমিশনার কিরণ চন্দ্র দে, ম্যাজিষ্ট্রেট সুশীল সিং এবং মালিক পক্ষের প্রতনিধি ফার্গুসনের নেতৃত্বে চাঁদপুর অবস্থান নেয় ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত আসাম রাইফেলর্সের গোর্খা বাহিনী।

 

তারা চাঁদপুর রেলস্টেশন থেকে স্টিমার ঘাটে অবস্থানরত ক্লান্ত- ক্ষুধার্ত শ্রমিককে উপর শুরু করে পৈশাচিক নির্যাতন। তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে হাজার হাজার চা শ্রমিকে হত্যা করে। পরিশেষে গুলিবৃদ্ধ লাশ এবং আহত শ্রমিকের পেট কেটে নদীতে ফেলা দেয়। যাতে করে লাশগুলো নদীতে ভেসে না ওঠে ডুবে যায় এবং এই নরকীয় গণহত্যা প্রকাশ না পায়। সবশেষ চা শ্রমিকদের আন্দোলনকে চিরতরে দমন করতে পন্ডিত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিত ও পন্ডিত দেওশরন সহ অসংখ্য চা শ্রমিকদের গ্রেফতার করে। এই নীরব গণহত্যায় নিহত কিংবা আহতের সংখ্যা কতো হসেব করতে দেয়নি শাসকরা।

চা শ্রমিকদের উপর বর্বরচিত হত্যাকাণ্ডের কথা শুনে চাঁদপুরে ছুটে আসেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। তিনি হরদয়াল নাগসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আহত এবং আন্দোলনকারী চা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্যসেনসহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মী চা শ্রমিকদের আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চাঁদপুরে হরতাল ঢাকা হয়। হরদয়াল নাগ ছিলেন চাঁদপুরের এই আন্দোলনের স্থানীয় সংগঠক। চা শ্রমিকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে রেলশ্রমিক, জাহাজ শ্রমিক সহ ছাত্রজনতা। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিকরাও ধর্মঘটের ডাক দেয়। খবর পেয়ে চাঁদপুরে ছুটে আসেন মানবতার নেতা মহাত্মা গান্ধী, মওলানা মোহাম্মদ আলী, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো নেতারা। অবশেষে এই বিদ্রোহ এবং শ্রমিক আন্দোলনে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়েই রয়েল কমিশন গঠন করে শ্রমিকদের গিরমিট প্রথা বাতিলের ঘোষণা প্রদান করে এবং তাদেরকে রেশনসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাগানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

ইতিহাসের নির্মমতম এই শ্রমিক হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করে ২০০৮ সাল থেকে ২০ শে মে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসাবে পালন করছে চা শ্রমিকরা। দীর্ঘ বছর ধরে তারা দিবসটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবী জানিয়ে আসছে। কিন্তু দু’শ’ বছরেও চা শ্রমিকরা যেমন দাস প্রথার অদৃশ্যজাল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি, তেমন-ই পারেনি তাদের ন্যার্য দাবি প্রতিষ্ঠা করতে। জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসেনি চা শ্রমিকদের এই নির্মম গণহত্যা।

ফলে একুশ শতকে এসেও চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী ১০২ টাকা, সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে স্কুলের জন্যে চা শ্রমিক বাবা-মাকে রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে হয়। তারচেয়ে আরো আশ্চর্যের কথা, পৃথিবীর ইতিহাসের এই মির্মমতম এই গণহত্যার একশ বছরেও চাঁদপুরে কোনো স্মৃতিচিহ্ন কিংবা ভাষ্কর্য স্থাপন করা হয়নি। যা দেখে নতুন প্রজন্ম অধিকার আদায়ে চা শ্রমিকদের জীবন দেয়ার ইতিহাস জানতে পারবে।

তথ্যঋণ : দৈনিক আজাদী’র বিশেষ প্রকাশনা ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’, বঙ্গদর্শন, আসামের ভাষা আন্দোলন, ও বাঙালী প্রসঙ্গ ১৯৮৭-১৯৬১, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক।

লেখক ও সংবাদকর্মী: আশিক বিন রহিম

আরও পড়ুন : চাঁদপুরসহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ থেকে …..

Share