গল্প : ন্যায়বিচার

‎Tuesday, ‎May ‎19, ‎2015  10:28:59 PM

শরিফুল ইসলাম নাঈম :

তোতা মিয়া খুবসহজ সরল একটা মানুষ, মাথায় বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম।

দু’ভাইয়ের সবার ছোট তোতা মিয়া। দুই ভাই যতটা ভালো, ঠিক ততটা স্বার্থপর। স্বার্থের জন্যে তারা সব করতে পারে।

মা-বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। তোতার বয়স, যখন ২০ বছর হলো তখন দু’ভাই মিলে তোতাকে বিয়ে দেয় পাশের গ্রামের নাছিমার সাথে।

লেখাপড়া বেশি না করলেও অনেক চালাক নাছিমা। বিয়ের পর তোতা সুন্দর করে সংসার করতে লাগলো। পাশাপাশি দু’ভাইয়ের সাথে নিজেদের জায়গাজমি দেখাশোনা করে।

কিছুদিন পর তোতার একটি ছেলে হয়। নাম হলো নয়ন। কয়েক বছর যাবার পর। নিজের বউয়ের কথায় নিজের জমির ভাগ চায় দু’ভাইয়ের কাছে।

তোতার বউ নাছিমা বুঝতে পরে দু’ভাই তোতাকে ঠকাচ্ছে। অনেক আগেই দুই ভাই মিলে সব জায়াগা জমি নিজেদের নামে করে নিয়েছে। এটা তোতা জানত না কিন্তু তোতার বউ গোপন সূত্রে জানতে পারে। তারপর গ্রামের সালিশ-মাতাব্বরের কাছে যায়। ঘটনা খুলে বললে মাতাব্বর বলে যে, কিছু একটা করবে।

দুই ভাই তখন তোতার বউয়ের ব্যাপারটা বুঝতে পারে। তখন তারা দুই ভাই মিলে শালিম-মাতাব্বরের কাছে গিয়ে তাদের জালিয়াতির কথা খুলে বলে এবং গ্রামের মাতাব্বরদের অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দেয়। পরে যখন তোতার বউ মাতাব্বরের কাছে আবার আসে এবার আর নাছিমার কথা গ্রামর মাতাব্বররা পাত্তা দিল না।

তখন তোতার বউ কিছুটা বুঝতে পারে যে, টাকা দিয়ে গ্রামের মাতাব্বরের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। নাছিমা তোতাকে সব খুলে বলার পর তোতা মিয়া সব বুঝতে পারলো। তারপর তোতা তার ভাইদের কাছে গিয়ে বললো, আমি লেখাপড়া করি নাই। তাই জায়গাজমির হিসাব একটু কম বুঝি। কিন্তু তাই বলে আমার লগে তোমরা বেঈমানি করলা? এইডা তোমরা ঠিক কর নাই ভাই, আমি তোমাদের নামে মামলা দিমু।

তোতার বড় ভাই বললো কিরে তোতা, এই কথা কি তোর বউ শিখাইছে নাকি। মামলা কারে কয় তুই জানস? আমরা তোর ভাই, তোর ভালোমন্দ আমরা বুঝমু। বউয়ের কথা শুনস ক্যান তোতা?

না ভাই আমার জমি আমার কাছে বুঝাইয়া দিতে বলছে আমার বউ নাছিমা।

দেখ তোতা, তোর বউ কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করতাছে, ভালা হইবোনা কইলাম। এরপর তারা দুই ভাই মিলে বুদ্ধি করলো যে, তোতার বউ নাছিমাকে কিছু একটা করতে হবে, তখন তারা দুই ভাই মিলে বুদ্ধি করলো নাছিমাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার জন্যে।

তারা তাদের বুদ্ধিমত নাছিমাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেললো।

এরপর তোতার ভাইয়েরা এলাকাবাসীর কাছে বললো যে, তোতার অত্যাচারে তার বউ বিষ খেয়ে মারা গেছে।

তোতাকে বউ হত্যার দায়ে এলাকাবাসী পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিল। বিচারে তোতার চৌদ্দ বছর জেল হয়।

জেল খেটে চোদ্দ বছর পর তোতা, বাহিরে বেরিয়ে আসে, এতদিনে তোতার দুই ভাই তাকে ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করেনি।

তোতা জেল থেকে এসে তার ছেলে নয়নের কাছে যায়। তোতার ছেলের তখন ১৬ বছর বয়স। তার ছেলের কোনো দেখা পেলো না। গ্রামের লোকদের মুখে শুনেছে শহরে কোনো কাজের সন্ধানে গেছে।

ভাইদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল না তার। তাই ছেলেকে খোঁজার জন্য, শহরের উদ্দেশে রওনা হলো।

জীবনের প্রথম শহরে পা দিলো তোতা। সবকিছু অচেনা কোথায় যাবে বুঝতে পারছে না। ক্ষুধা লাগলে দোকান থেকে কলা ও রুটি খায়। কিন্তু টাকা না দিতে পারায় দোকানদারের হাতে অনেক অপমান হতে হয়েছে।

অনেক রাত রাস্তায় রাস্তায় কাটাতে হয়েছে। এতদিনে তোতা পাগলের মতো হয়ে গেছে।

একদিন ক্ষুধার জ্বালা পেটে নিয়ে তোতা রাস্তার পাশে একটি বসার টেবিলে শুয়ে আছে। এমন সময় ঢাকার শহরে হরতালের গোলাগুলি, বোমার আগাতে তোতার দেহ ঝলসে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তোতা মারা যায়।

তোতা মরার আগে বলে, যাদের জন্যে এত দুঃখ-কষ্ট জীবনে সয়েছে তাদের বিচার খোদা তুমি এই জমিনে করবা।

তোতার লাশ নেয়ার মতন কেউ ছিলো না। কিছুদিন মর্গে থাকার পর সরকারিভাবে দাফন হয় তোতার লাশ।

এর কিছুদিন পর তোতার দুই ভাই ও তাদের স্ত্রী ছেলে মেয়ে, পরিবারের সবাই মিলে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গাড়িতে করে রওয়ানা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িটি উল্টে খাদে পড়ে গেলো।

খাদে পড়ে ওই গাড়িতে আগুন ধরে যায় এবং গাড়ির ভেতরে পরিবারের সাবাই প্রাণ হারায়। পুরে ছাই হয়ে যায় সবার লাশ কোনটা কার লাশ কেউ চিনতে পারেনি।

যে সম্পত্তির জন্য নিজের সহজসরল ভাই তোতাকে এতো অন্যায়-অবিচার করেছে দু’ভাই মিলে, আজ কোথায় সে সম্পত্তি? কেউ নেই ভোগ করার মতো। সবাইকে একসাথে বিদায় নিতে হয়েছে এই পৃথিবী থেকে।

এটা ছিলো হয়তো তাদের প্রতি তোতার মৃত্যুর সময় দেয়া অভিশাপ। এখন পরিবারে শুধু একজনই বাকি থাকে, সে হলো তোতার ছেলে নয়ন। এরপর থেকে সব সম্পত্তির মালিক হয় সে।

তোতার ছেলে নয়ন কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রামে তার বাবার নামে অনেক টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদরাসা বানিয়ে দেয়।

তোতার ভাইরা তোতাকে ঠকালেও আল্লাহ তোতার জন্যে ন্যায্যবিচার করেছেন। একেই বলে ন্যায়বিচার।

চাঁদপুর টাইমস : এমআরআর/২০১৫

 

নিয়মিত ফেসবুকে নিউজ পেতে লাইক দিন : www.facebook.com/chandpurtimesonline/likes

চাঁদপুর টাইমস’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Share