কোভিড-১৯ এর শিক্ষা : পুঁজিবাদের বিকল্প চিন্তা !

করোনা মহামারীর কারণে সারাবিশ্ব ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ মানুষ্য সৃষ্ট,কিন্তু মহামারী প্রকৃতি প্রদত্ত তৎসত্তে্ওব এ মহামারী মনুষ্য সৃষ্ট কিনা বলা যাচ্ছে না। কেন না আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নততর যুগে অসম্ভব বলে কিছু নেই একমাত্র জীবনদান ছাড়া। আগের দিনে মহামারী প্রকৃতি প্রদত্ত হলেও তাকে ব্যবহার করে পুঁজিবাদী বিশ্বের উপনিবেশিক দুর্বৃত্ত বা বুর্জোয়ারা ধনী থেকে আরও ধনী হয়েছে।

বাজারে, আর্থিক মন্দা ও কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে মহামারী আক্রান্ত মধ্যবিত্ত,নিম্মনধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষ কাজ-কর্মহীন হওয়ার কারণে তাদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনও হারাতে হয়। আর সে সুযোগটাই বুর্জোয়া রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থার আনুকূল্যে পালা-পোষা দুর্বৃত্তরাই গ্রহণ করে এক ধরনের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে।

কোভিড-১৯ মহামারীতে ইতোমধ্যে লাখ লাখ লোক মারা গেছে এবং কোটি কোটি লোক আক্রান্ত হয়েছে। এতে সারা দুনিয়ার মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নানা সন্দেহ, আতঙ্ক ও অবিশ্বাস। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষের জীবন-যাপন ও আচরণের পরিবর্তন হয়েছে ব্যাপক। বিশেষতঃ বিশ্বের যুদ্ধবাজ-আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার রণপতি ও রাজনৈতিক নেতারা একে অপরকে দুষছে। আর এটাই স্বাভাবিক। মহামারী মন্বন্তরে মানুষের গণহারে মৃত্যুতে শকুন আর শেয়াল যেমন কামড়া-কামড়িতে লিপ্ত থাকে,তেমনি বিশ্ব কার দখলে বা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এটাই মূলত এদের দ্বদ্ব।

বিশ্বের বড় বড় বুদ্ধিজীবী,অর্থনীতিবিদ,বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা এ নিয়ে সন্দেহের তীর উঁচিয়ে দিচ্ছে। বিশেষভাবে বলতে হয়, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেছেন,“করোনার জীবাণু কমিউনিস্ট চীন নয়,আমেরিকাই সৃষ্টি করেছে”(ভারত নিউজ, ৩০ মে ’২০)। অপরদিকে ধনতান্ত্রিক দেশ জাপানের মেডিসিনে নোবেল বিজয়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানী তাসুক হোনজো, তার সন্দেহ চীনের দিকে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন-“এ কাজ চীন করেছে এবং একদিন তা প্রমাণিত হবে।” (উইকেপিডিয়া,তাসুকু হোনজো)

ভারতের আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী এবং খ্যাতিসম্পন্ন লেখিকা অরুন্ধতী রায় বলেছেন,“ করোনা ভাইরাস মহমারী পুঁজিবাদের যন্ত্রটাকেই থমকে দিয়েছে। কিন্তু এটি সাময়িক। তিনি এও বলেছেন,কোন দেশের উপর অর্থনৈতিক অবরোধের ধারণা,যার মধ্য দিয়ে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে এমনকি জীবন রক্ষাকারী ঔষধ থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। তারা এ পৃথিবীর ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে, যা এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করবে,যার তুলনায় কোভিড-১৯ তো ছেলেখেলা। আমরা যদি দ্রæত এর প্রতিকার না করতে পারি, তাহলে লকডাউন উঠে গেলেও আমরা চিরকালের মতো বন্দি হয়ে যাব।” (‘কীভাবে এই পুঁজিবাদের যন্ত্রকে বিকল করা যায়? বস্তুতঃ সেটাই এখন দায়িত্ব।’, দেশ রূপান্তর, ৯ মে, ২০২০)।

পুঁজিবাদীবিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বিল গেটস উপলব্ধি থেকে বলেছেন,‘আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে দারুণভাবে সম্পৃক্ত। জগতের সবকিছুই একটি অণুবন্ধনে আবদ্ধ। সীমান্তরেখাগুলো আসলেই মিথ্যা।এগুলোর মূল্য কত কম তা এ ভাইরাস বুঝিয়ে দিয়েছে। আপনারা ভাল করেই দেখেছেন সীমান্ত পাড়ি দিতে ভাইরাসের ভিসা,পাসপোর্ট কোন কিছুই লাগে না। ভাইরাস স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে কত স্বার্থপর আমরা। জড়বাদী, ভোগবাদী আর বিলাসের সমাজই তৈরি করেছি।সংকটময় মুহূর্তে বুঝা যায়,জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হচ্ছে- খাদ্য,পানি আর ঔষধ। দামি বাড়ি, গাড়ি আর বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বাড়ী,গাড়ি একজন মানুষকে বাঁচাতে পারে না। যেমন পারে ঔষধ, খাবার আর পানি।”

সর্বোপরি উপরোক্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বললে অত্যুক্তি হবে না, করোনা মহামারী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, পুঁজিবাদীবিশ্বায়ন বিশ্বব্যাপী মানুষের কল্যাণের কথা কখনই চিন্তা করে না। করার কোন প্রয়োজনীয়তাও তারা বোধ করে না। ব্যক্তির স্বার্থ ও শোষণ,নিপীড়ন এবং লুণ্ঠন হলো এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। পৃথিবীকে ধ্বংস করার জন্য যত প্রকার কর্মকৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আবিষ্কার আছে,তারা সেদিকেই ধাবিত। মানুষের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, খাদ্য-নিরাপত্তা, সুপেয়-পানি ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা তারা যে দিতে পারে না তা করোনা ভাইরাস লাখ লাখ মানুষের প্রাণ সংহার করে প্রমাণ করে দিল।

অপরদিকে, সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব পারে সারা পৃথিবীর মানুষের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, খাদ্য,পানীয় ও বাসস্থানের সুব্যবস্থা করতে। চীন,রাশিয়ার কথা বাদ দিলাম,কিউবার চিকিৎসকদের করোনাকালীন স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজতান্ত্রিক কিউবা, উত্তর কোরিয়া আর ভিয়েতনাম রাষ্ট্রে করোনা রোগীর স্বল্পতাই প্রমাণ করে দিয়েছে, বিশ্বব্যবস্তায় তথা সমাজতন্ত্রের বিশ্বায়নের দ্বিতীয় কোন বিকল্প নেই বললে ভুল হবেনা।

তবে এটাও ঠিক, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার ফলে পুঁজিবাদী বড় বড় আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপুল অগ্রগতি সত্তে¡ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মানবিক গুণাবলির কোন উন্নতি হয়নি। সবকিছুর মতো মানুষ্যত্বও বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। মূলতঃ শ্রম-শোষণ ও ব্যক্তিপুঁজির বিকাশই হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেমন অগ্রগতি ও উন্নতি হয়, তেমনি মানবিক মূল্যবোধকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। শ্রেণী স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে সব মানুষের সমান সুযোগ প্রদানসহ শ্রম-শোষণের কোন ব্যবস্থাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রশ্রয় দেয় না। কারণ সামাজিক মালিকানায় সব নাগরিকই রাষ্ট্রের মালিক।

বাংলাদেশের পুঁজিবাদীব্যবস্থার চিত্র আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশে পুঁজির বিকাশ নির্দিষ্ট গতিতে বিকাশ ঘটেনি। ঘটেছে বিকৃত নীতি ও গতিতে। একদিকে একটি নির্ভরশীল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা। কারণ বাজেটের অনেকটা নির্ভর করে বিদেশী সাহায্য বা এইড ও ঋণ এর উপর।

অপরদিকে,রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকলকারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং ক্ষমতাধর রাজনীতিক, বড় বড় ব্যবসায়ী এবং আমলাদের দুর্নীতি ও অবৈধভাবে সম্পদ আহরণের মাধ্যমে। যার ফলে মানবিক মূল্যবোধ বলতে আজ আর কোন কিছু আছে বলে মনে করা কষ্টকর। নৈতিকতা, সততা ও একের প্রতি অন্যের শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ এবং শুভবুদ্ধি বলতে কিছু আছে কিনা বলতে সাহস হচ্ছে না।

আজ এ করোনাকালে যেমন রাষ্ট্রীয় দুর্বৃত্তদের হাতে অবাধে গরিবের বরাদ্দ ধনসম্পদ লুণ্ঠন হচ্ছে,তেমনি করোনা আক্রান্ত পিতা-মাতাকে তার সন্তানরা হাসপাতালের বারান্দায় কিংবা জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসছে। আদিম সমাজেও এমন নির্মম ঘটনা ঘটেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না।

এ প্রেক্ষিতে করোনা মহামারী এবং করোনা মহামারী উত্তর সংকটে মোকাবেলা করার মতো স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় আছে কিনা সন্দেহ। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলতে দেশে চলছে তুঘলকি সব কান্ড। করোনা মহামারী যে হারে বিস্তার লাভ করেছে। তার চেয়েও শতগুণ দুর্নীতি মহামারী চলছে।

এমন কোন খাত নেই যে খাতে নেই ভয়াবহ ঘুষ-দুর্নীতি আর চুরি-লুণ্ঠন। ব্যাংক-বীমা,পুঁজিবাজার, যোগাযোগ,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,ত্রাণ, আইনশৃঙ্খলা,গ্রাম-শহর,নগর-বন্দর সব জায়গায় যে প্রকারে লুণ্ঠন চলছে এবং অর্থপাচার হচ্ছে- তাও এ মহামারীর মধ্যে,পত্রিকা খুললেই দেখতে পাই-সে কথা বলে শেষ করা যাবে না।

এহেন অবস্থায় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টানো ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় নেই বললে অত্যুক্তি হবেনা এবং তা পারে একমাত্র জনগণ। আর জনগণই হচ্ছেন সব ক্ষমতার উৎস।

লেখক পরিচিতি : অধ্যাপক মো. হাছান আলী সিকদার, সভাপতি, চাঁদপুর জেলা জাসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা, বাকশিস নেতা, চাঁদপুর জেলা।

Share