Home / সারাদেশ / কুমিল্লায় কারাগারের দেয়াল নির্মাণকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ সচেতন সমাজ
কারাগারের

কুমিল্লায় কারাগারের দেয়াল নির্মাণকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ সচেতন সমাজ

কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের শতবর্ষী সীমানা প্রাচীরের ৩০ ফুট বাইরে মহাসড়ক ঘেঁষে নতুন দেয়াল নির্মাণের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার সচেতন সমাজ। সিটি কর্পোরেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের মতামত ছাড়াই শুরু হওয়া এই কাজে ক্ষুব্ধ কুমিল্লার নাগরিক সমাজ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লা নগরীর বুক চিরে বয়ে গেছে নগরীর ‘ফুসফুস’ খ্যাত ১৬শ শতকের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এই সড়কের পাশেই অবস্থিত শতবর্ষী কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার। এর বিপরীত পাশে অবস্থিত কুমিল্লার তিনটি প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান— কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কুমিল্লা জেলা পরিষদ এবং কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন। সম্প্রতি কারাগারের পুরনো সীমানা প্রাচীর ভেঙে প্রায় ৩০ ফুট জায়গা দখল করে মহাসড়ক ঘেঁষে নতুন দেয়াল তোলার কাজ শুরু করে কর্তৃপক্ষ।

ফলে ধ্বংস করা হয়েছে সিটি কর্পোরেশনের সাজানো ফুলবাগান ও জনগণের চলাচলের ফুটপাত। এতে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে ঐতিহ্য, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে ঐতিহাসিক মহাসড়ক ও জনগণের চলাচলের রাস্তা। অভিযোগ উঠেছে, এই নির্মাণে সড়ক ও জনপথ বিভাগ কিংবা জেলা প্রশাসনের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।

ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সৌন্দর্য ও ফুটপাত রক্ষার দাবিতে এ ধরনের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে গত ১৫ জানুয়ারি বিকেলে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম এই স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন। এ সময় ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’, ‘কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চ’, ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’ ও ‘তরী বাংলাদেশ’-এর প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।

‘কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চ’-এর নেতা নাসির উদ্দিন বলেন, “ঐতিহ্যের প্রতীক এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ওপর জেল কর্তৃপক্ষ যেভাবে দেয়াল নির্মাণ করে রাস্তা দখল করছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়কে বলেছি, এই কাজটি অবিলম্বে বন্ধ করে সঠিক ম্যাপ অনুযায়ী যেন দেয়াল নির্মাণ করা হয়। জবরদখল বন্ধ না হলে ছাত্র-জনতা রাজপথে কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।”

‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’-এর সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, “পুরাতন দেয়ালটি ভেঙে ৩০ ফুট বাইরে সরিয়ে আনায় রাস্তা সংকুচিত হচ্ছে এবং ফুটপাতে মানুষের চলাচলের কোনো জায়গা থাকছে না।” একইভাবে ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন- “কুমিল্লার ঐতিহাসিক এই সড়কটি শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি এই শহরের ফুসফুস এবং ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবেশেস উপর আঘাত করে কোনো স্থাপনা করা যাবেনা।”
এ বিষয়ে গত ১৬ জানুয়ারি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শাহ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জেল সুপার কোনো প্রকার আলোচনা বা অবহিত না করেই কিছুটা আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই দেয়াল নির্মাণের প্রয়াস নিয়েছেন। তিনি রাস্তা এমনভাবে কেটেছেন যে, আমাদের ড্রেন ও রাস্তা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন উদাসীনতা দুঃখজনক।”

সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুনকে ডেকে পাঠান। এবং সাফ জানিয়ে দেন যে, শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হবে বা নাগরিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে এমন কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়।”

এই নির্দেশনার পর কয়দিন নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা হলেও সম্প্রতি আবারও কাজ শুরু হলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন নগরীর সচেতন নাগরিকরা। এঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার দুপুরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিপরিত দিকে কুমিল্লা কেন্দ্রিয় কারাগারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। কুমিল্লার সচেতন নাগরিকের ব্যানারে আয়োজিত মাববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কুমিল্লার বিভিন্ন রাজনৈতক দলের নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধ, সামাজিক সংগঠন ও সাংবাদিকরা অংশগ্রহন করেন।

এসময় বক্তব্য কালে কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন- “কুমিল্লার এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি আমাদের ঐতিহাসিক একটি সম্পদ। কারাগারের নিরাপত্তা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেটা কি জনগণের চলাচলের পথ বন্ধ করে হতে হবে? উন্নয়ন হতে হবে জনবান্ধব, জনভোগান্তি বাড়িয়ে নয়। আপনাদেরকে জনগণের ভাষা বুঝতে হবে। ”

কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিবেক’-এর প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ মোল্লা টিপু তার বক্তব্যে বলেন- “কুমিল্লার এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এই রাস্তার ওপর জবরদখল করে জেলখানার সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা দেখছি যে ফুটপাত দখল করে দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ফলে জনগণের চলাচলের কোনো জায়গা থাকছে না। এটি অত্যন্ত জনবিরোধী একটি কাজ।”

বক্তারা ফুটপাত ও ড্রেন নষ্ট করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জবরদখল বন্ধে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, “আমি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং জেল সুপারকে বলেছি বিষয়টি দেখতে। কারাগার এবং সড়ক দুটিই সরকারি সম্পত্তি। নিয়ম মেনে কতটা সমন্বয় (Compromise) করে কাজটা করা যায়, যাতে ফুটপাত ও নালা ঠিক থাকে, সেই চেষ্টা চলছে।”

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা জানান, তারা সীমানা ও প্রশস্ততার বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন।

তবে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থানে অনড়। সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন বলেন, “আমরা আমাদের নিজস্ব সীমানা বা প্রপার্টি লাইন অনুযায়ী কাজ করছি। প্রাচীরটি আগের জায়গাতেই হচ্ছে, শুধু মাঝখানের পুরনো ওয়ালটি অপসারণ করা হয়েছে। কারাগারের নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি করা হচ্ছে, রাস্তা সংকীর্ণ করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই।”

ঐতিহ্য রক্ষা এবং কারাগারের নিরাপত্তা—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনভোগান্তি লাঘবে একটি পরিকল্পিত কারিগরি সমীক্ষা ও আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন কুমিল্লার সুশীল সমাজ।

প্রতিবেদক: জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল,
২৭ জানুয়ারী ২০২৬