বয়স ৮৫ বছর। শরীরের শক্তি অনেকটাই কমে এসেছে, কিন্তু থেমে যায়নি জীবিকার সংগ্রাম। হাতে ছোট্ট একটি সরঞ্জামের বাক্স নিয়ে আজও শহরের পথে পথে ঘুরে মানুষের কান পরিষ্কার করেন মো. শাহাজাহান খান। প্রায় ৭০ বছর ধরে কান পরিষ্কার করার কাজ করে আসছেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময় এই পেশায় কাটিয়ে এখনো নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছেন এই বৃদ্ধ।
মো. শাহাজাহান খান চাঁদপুরের ফরক্কাবাদ এলাকার চাপিলা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম নুর বকসো খান। গত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কান পরিষ্কারের কাজ করছেন। এর আগে দীর্ঘদিন ঢাকার সায়েদাবাদ, কারওয়ান বাজার, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, চিটাগাং রোড, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এই পেশায় কাজ করেছেন।
শাহাজাহান জানান, ছোট বয়স থেকেই তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। একসময় মাত্র আট আনা থেকে এক টাকা পারিশ্রমিকে মানুষের কান পরিষ্কার করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের পারিশ্রমিকও বেড়েছে। ঢাকায় কাজ করার সময় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার থেকে ১২’শ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। তবে বর্তমানে চাঁদপুর শহরে কাজের পরিমাণ ও মানুষের সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে কখনো ৫০-৬০ টাকায় একেকটি কাজ করে থাকেন। ঢাকা শহরে তিনি ৫০/১০০ টাকা থেকে শুরু করে আবার কোনো কোনো কাজে ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত করেছেন বলে জানান।
প্রতিদিন তাঁর আয় একরকম থাকে না। কোনো দিন ১ হাজার থেকে ১২’শ টাকা পর্যন্ত আয় হয়, আবার কোনো দিন ৫০০-৬০০ টাকাতেই দিন পার করতে হয়। মানুষের প্রয়োজন ও কাজের ওপরই নির্ভর করে তাঁর দৈনিক উপার্জন।
দীর্ঘ সাত দশকের এই পেশাজীবনে কত মানুষের কান পরিষ্কার করেছেন, তার হিসাব নেই শাহাজাহানের কাছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তিনি খুঁজে নেন তাঁর পরিচিত কাজের মানুষ। বয়সের ভার শরীরে স্পষ্ট হলেও জীবিকার প্রয়োজনে এখনো পথে বের হন তিনি।
শাহাজাহান জানান, ঢাকার শহরে তাঁর কাজের অভাব হতো না। একটির পর একটি কাজ করতে হতো। ফলে সেখানে প্রতিদিনই মোটামুটি ভালো আয় হতো। কিন্তু চাঁদপুর শহরে সেই তুলনায় কাজ অনেক কম। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ ঘুরেও তেমন কোন কাজ পাওয়া যায় না। তাই সময় ও সুযোগ হলে আবার ঢাকায় চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।
৮৫ বছর বয়সেও জীবিকার তাগিদে পথে পথে হাঁটছেন শাহাজাহান। দীর্ঘ ৭০ বছরের পেশাগত জীবনে নানা শহরের অসংখ্য মানুষের কান পরিষ্কার করেছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও থেমে নেই তাঁর জীবনসংগ্রাম। জীবনের শেষ প্রান্তেও নিজের হাতে কাজ করে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
শাহাজাহানের পরিবারে রয়েছে তিন ছেলে সন্তান ও তিন মেয়ে। জীবনের বড় একটি সময় মানুষের কান পরিষ্কার করেই সন্তানদের বড় করেছেন। পেশাটি হয়তো এখন আর আগের মতো আয় দেয় না, তবুও দীর্ঘদিনের এই কাজই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
চাঁদপুর শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাঁটতে হাঁটতে ৮৫ বছরের শাহাজাহান যেন নিজেই হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত স্মৃতি। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে কাজের পারিশ্রমিকও। কিন্তু সাত দশক ধরে তাঁর হাতে থাকা সেই ছোট্ট সরঞ্জাম আর জীবিকার তাগিদে পথে পথে হাঁটার অভ্যাস এখনো বদলায়নি।
প্রতিবেদক: কবির হোসেন মিজি/
১০ অক্টোবর ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur