চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠে যখন নানা হিসাব-নিকাশ, তখন আলোচনায় একটি নাম বারবার ফিরে আসছে—কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জুয়েল। রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা, দুঃসময়ে দলের পাশে থাকা, একাধিকবার কারাবরণ, ব্যবসা ও গণমাধ্যমে সম্পৃক্ততা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে পৌর এলাকার বিভিন্ন মহলে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা আগ্রহ।
কিন্তু কে এই জুয়েল? রাজনীতির বাইরে তাঁর পরিচয়ই বা কী? আর কেনইবা আসন্ন পৌর নির্বাচন সামনে রেখে তাঁর নাম নিয়ে এত আলোচনা?
চাঁদপুর পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারের সন্তান ইব্রাহীম জুয়েলের রাজনৈতিক পথচলা শুরু ছাত্রজীবনে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেন চাঁদপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সভাপতি হিসেবে। পরে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করেন।
রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় তিনি যুক্ত হন জেলা বিএনপির রাজনীতিতে। দায়িত্ব পালন করেন প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে। পরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিবের দায়িত্বও পান।
বিশেষ করে ১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটকাল এবং পরবর্তী সময়ে দলের কঠিন পরিস্থিতিতে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর একটি নিজস্ব অবস্থান তৈরি হয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আলোচিত অধ্যায়ের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে মামলা ও কারাবাস। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে ২২টিরও বেশি মামলা হয়েছে। ২০১৫ সালে টানা প্রায় ছয় মাস কারাগারে ছিলেন তিনি। সেই সময়ও সহবন্দী নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানান।
শুধু মামলা-কারাবাস নয়, তাঁর পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন সময়ে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি জুয়েল।
রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়ও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ও সরবরাহকারী হিসেবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় গণমাধ্যমেও সক্রিয় তিনি।
বর্তমানে দৈনিক চাঁদপুর সময়, চাঁদপুর টাইমস এবং দৈনিক মতলবের আলো-এর সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্বে রয়েছেন কাজী ইব্রাহীম জুয়েল। চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্য হিসেবেও তিনি যুক্ত।
সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। বায়তুল কাদের জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি, ফিরোজা হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এবং আল হেরা একাডেমির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। পাশাপাশি রোটারি, রেডক্রিসেন্ট, ডায়াবেটিক সমিতি ও চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্সসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
করোনাকালীন সময়, বন্যা ও বিভিন্ন দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও তাঁর সামাজিক পরিচয়ের অন্যতম অংশ বলে জানান তাঁর অনুসারীরা। বিশেষ করে দলীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে পাশে থেকে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টিতে স্থাপন করেন।
সব মিলিয়ে কাজী ইব্রাহীম জুয়েলের পরিচয় শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সমাজকর্মী—চারটি পরিচয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর বর্তমান অবস্থান।
আর এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই হয়তো আসন্ন চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে তাঁর নামকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
পৌরবাসীর প্রত্যাশার জায়গাটিও স্পষ্ট—আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, মাদকমুক্ত ও নাগরিকবান্ধব একটি পৌরসভা। এক্ষেত্রে শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, সততা এবং তারুণ্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে পৌরসভার সচেতন নাগরিক মহল। সেই প্রত্যাশা পূরণে কে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে প্রার্থী মনোনয়ন ও নির্বাচনের চূড়ান্ত সমীকরণ এখনও স্পষ্ট নয়। তাই কাজী ইব্রাহীম জুয়েল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকছেন কি না, আর থাকলে তাঁর প্রভাব কতটা—সেই উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।
প্রতিবেদক: আশিক বিন রহিম/
৪ অক্টোবর ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur