Home / চাঁদপুর / উচ্চ ঝুঁকিতে চাঁদপুর সদর-হাইমচর, কাল থেকে শুরু হচ্ছে হামের জরুরি টিকা

উচ্চ ঝুঁকিতে চাঁদপুর সদর-হাইমচর, কাল থেকে শুরু হচ্ছে হামের জরুরি টিকা

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় রোববার সকাল ৯টা থেকে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও পৌর এলাকায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু করছে সরকার। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলা।

প্রথম ধাপে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি সব শিশুকে এ টিকার আওতায় আনা হবে। তারা আগে টিকা নিয়ে থাকুক বা না থাকুক, সবাই টিকা পাবে।

শনিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪২ জনের এই রোগ শনাক্ত হয়েছে; আর হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪৭ জন।

এক দিনে হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩১৫ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। আর সবচেয়ে কম ৪২ জন ভর্তি হয়েছেন রংপুরের হাসপাতালগুলোতে।

আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয় ওই বুলেটিনে। আর গত ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

হামের এই প্রাণঘাতি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে হাম-রুবেলার জরুরি টিকা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয় সরকার।

শনিবার প্রথম ধাপে যেসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকা কার্যক্রম শুরু হবে সেই তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে বলেন, “জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় টিকাদান বিষয়ক কারিগরি পরামর্শক কমিটি (এনআইটিএজি) একটি জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ করেছে।”

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “এই কার্যক্রম একটি সমন্বিত প্রতিরোধ পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস মানে পাঁচ বছরের চাইতে এক মাস কম, এই গ্রুপটাকে আমরা কালকে থেকে শুরু করতেছি। এটাকে আমরা ফাস্ট কাভার করতে চাচ্ছি সারাদেশে।”

তিনি বলেন, “এই ৩০টা উপজেলা শুরু করা মানে আমাদের কার্যক্রম শেষ না। আমরা এটাকে যেহেতু এখানে প্রবল আকার ধারণ করেছে। এটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাকিগুলিতে আমরা কাজে অগ্রসর হব। ইনশাআল্লাহ, কোনোটাই থেমে থাকবো না।”

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, প্রথম পর্যায়ে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ এলাকায় কর্মসূচি শুরু হবে। পরে রোগের পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ভিত্তিতে তা ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য, ২১ মে’র মধ্যে এই জরুরি কার্যক্রম শেষ করা।

আক্রান্তদের জন্য ভিটামিন ‘এ’

হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে। তবে টিকা নিতে আসা সুস্থ শিশুদের এটি দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “যাদের মিসেলস হয়েছে তাদেরকে আমরা সাথে সাথে ভিটামিন এ খাওয়ায়ে দেব। ভিটামিন ‘এ’ প্রত্যেক হসপিটালে, যেখানে রোগী আছে এটা খাইয়ে দেওয়া হবে এই আমাদের এই কর্মসূচির ভিতরে। কিন্তু মনে রাখবেন যাদের টিকা দেওয়া হচ্ছে সুস্থ, তাদেরকে কিন্তু ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হবে না।”

তিনি বলেন, “আবার বলি, যারা অসুস্থ হাম আক্রমণ হয়েছে অথবা জ্বর হয়েছে হামের সম্ভাবনা আছে শুধু আক্রান্ত চিকিৎসাধীন রোগীদেরকে ভিটামিন এ দেওয়া হবে যাদেরকে এর বাইরে অসুস্থ না কিন্তু আমরা টিকা দিচ্ছি তাদেরকে ভিটামিন এ দেওয়া হবে না।”

মন্ত্রী বলেন, “৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুকে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। তবে যেসব শিশুর জ্বর আছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদেরকে এই সময় টিকা দেওয়া হবে না। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর টিকা গ্রহণ করবে।”

টিকাদান কার্যক্রম সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোববার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রম চলবে।

স্থানীয়ভাবে কোথায় টিকা দেওয়া হবে, তা জানিয়ে দেওয়া হবে, বলেন তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “ওটা তো স্থানীয়ভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে কোন জায়গায় দেবে। আমি আপনাদেরকে স্পটগুলি বললাম ঢাকার নবাগঞ্জে কোথায় হবে সিভিল সার্জন ‘অ্যারেঞ্জিং মাইকিং’ করা হবে, ওখানে জানিয়ে দেবেন, অমুক জায়গায় টিকা দেওয়া হবে, বাচ্চাদের নিয়ে আপনারা আসেন।”

স্কুল, মাদ্রাসা, শ্রমঘন এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতেও টিকাদান কেন্দ্র হতে পারে বলে ব্রিফিংয়ে ইঙ্গিত দেন তিনি।

আগে টিকা নেওয়া থাকলেও পাবে

আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও এই জরুরি কর্মসূচির আওতায় আসবে বলে তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “ছয় মাস থেকে ৫৯ মাসের ভেতরে যারা আছে, আগে পাক বা না পাক, সবাই পাবে।”

টিকা নিলে ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলেও মন্ত্রী দাবি করেন।

তিনি বলেন, “এই টিকাটা নিলে পরে কোনো ক্ষতি হয় না, এটা আমাদেরকে তারা বলেছেন। কাজেই এটা নিয়ে চিন্তা করা তো… কোনো ক্ষতি হয় নাই, ‘সাইড রিঅ্যাকশন’ নাই, কাজেই টিকাটা দেওয়া যায়, আমরা দিয়ে যাব।”

‘আতঙ্কিত না হওয়ার’ আহ্বান

গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনারাই কিন্তু বাঁচাইতেও পারেন, আপনারা কনফিউজও করাইতে পারেন।”

তিনি বলেন, “আপনারা একটা মেসেজ দেবেন, আমরা কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করতেছি, মৃতুহার কমিয়ে আনতে। ইনশআল্লাহ এখন ট্কিাদান কর্মসূচিতে চলে যাচ্ছি, আশা করি আমরা পুরো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেব।”

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাতি যেন আতঙ্কিত না হয়, আমরা করোনার মতো জিনিসকে, বিশ্বের যে কোনো দেশের চাইতে আমরা ভালো ‘মেনটেইন’ করেছি। আমাদের ডাক্তাররা আশা করি এটাও আমাদের ডাক্তাররা, যেভাবে পরিশ্রম করতেছে বিশ্বাস করেন, এরা এখন মৃত্যুর ভয় নাই সমানে কাজ করতেছে। আমাদের মানুষকে বাঁচানোর জন্য।”

মন্ত্রী বলেন, “আমরা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ব্যবহৃত টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, তবে সবাইকে সচেতন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”

ব্রিফ্রিংয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিয়া হায়দার বলেন, “বাংলাদেশে সর্বশেষ এই হামের টিকা ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০ এর ডিসেম্বর মাস থেকে ২০২১ এর জানুয়ারি পর্যন্ত। সুতরাং ওর পরে যে আমরা ছয় মাস থেকে নিচের বাচ্চা কনসিডার করি, তাহলে পরে কিন্তু এরা সবাই জন্মগ্রহণই করেছে আমাদের শেষ ক্যাম্পেইনের পরে।”

আইসিইউ চাপে, বিকল্প ভাবছে সরকার

শিশু হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ সংকট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগী বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, “আইসিইউ সংকট বলতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, যা…আইসিইউ তো ডেইলি বাড়ানো যায় না। আমাদের যে আইসিইউ সক্ষমতা আছে সেটা ভরে গিয়েছে, রোগী বের হচ্ছে রোগী ঢুকতেছে।”

মন্ত্রী বলেন, “আজকে ৬১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে যদি কারো আইসিইউর প্রয়োজন পড়ে, আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য বসে আছি এবং ইনশাল্লাহ ব্যবস্থা করব।”

২০২৫ সালে টিকাদান কমে যাওয়া নিয়ে তদন্ত হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা এখন কাজ করতে চাই। ওই অতীতের তদন্ত করে কাউকে ফাঁসি কাষ্টে ঝুলিয়ে আমার লাভ নাই, আমাকে আমার মানুষকে বাঁচাতে হবে, আমার শিশুদের বাঁচাতে হবে।”

বর্তমান দায়িত্ব ও কাজের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে সাখাওয়া হোসেন বলেন, “অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি এখন পর্যন্ত করতে চাচ্ছি না, ভবিষ্যতে কি হবে আমি জানি না।”

৩০ ‘হটস্পটে’ নিশ্চিত রোগী ২৭৫

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তালিকা অনুযায়ী, ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২৭৫। এর মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু ২২৪ জন, ৫ বছর থেকে ১০ বছরের কম বয়সী ২৩ জন এবং ১০ বছরের বেশি বয়সী ২৮ জন।

তালিকায় বরগুনা পৌরসভা ও সদর, পাবনা পৌরসভা ও সদর, চাঁদপুর পৌরসভা ও সদর, কক্সবাজারের মহেশখালী, গাজীপুর সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, পাবনার ঈশ্বরদী, নেত্রকোণার আটপাড়া, ময়মনসিংহ সদর ও ত্রিশাল, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, যশোর সদর, নাটোর সদর, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, কক্মবাজারের রামু, চাঁদপুরের হাইমচর, মাদারীপুর সদর, ঢাকার নবাবগঞ্জ, ঝালকাঠির নলছিটি, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরসহ আরও কয়েকটি এলাকা রয়েছে।

একযোগে উদ্বোধন

মন্ত্রী বলেন, রোববার সকাল ৯টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে এই জরুরি টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নবাবগঞ্জে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী পাবনা সদরে, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ঝালকাঠির নলছিটিতে এবং স্বাস্থ্য সচিব গাজীপুরে উদ্বোধন করবেন।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/

৪ এপ্রিল ২০২৬