উৎসবের ভোট : ইসির অগ্নিপরীক্ষা

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটে দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে প্রায় সব প্রস্তুতিই গুছিয়ে এনেছে নির্বাচন কমিশন । রাজনৈতিক দলগুলোও গণসংযোগ, পথসভা, সমাবেশে ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী,বিমানবাহিনী,কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপিকেও যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের লক্ষ্য একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন উপহার দেয়া। এ লক্ষ্য নিয়েই সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসি।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই শুধু গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করা সম্ভব। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কমিশন শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকবে-এটাই প্রত্যাশা।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, এ চ্যালেঞ্জে এই কমিশন যদি সফলতা অর্জন করতে পারে এবং ভোটারদের আস্থাহীনতা কাটিয়ে উঠতে পারে তাহলে তাদের আগামী পথচলা মসৃণ হবে। কারণ, এই নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করছে ইসির ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ। এটা দিয়ে যাত্রা শুরু হবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই প্রথম ভোট। আবার গণঅভ্যুত্থানের পর আমূল পাল্টেছে ডিসি-এডিসিসহ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। যারা আগামী নির্বাচনে মূল দায়িত্ব পালন করবেন। সেই সঙ্গে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। তবে নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের ওপর হামলা ও শঙ্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শঙ্কা প্রকাশ করলেও নির্বাচন কমিশন কোনো শঙ্কা দেখছে না।ইসি বলছে, বিভিন্ন মাধ্যমে তারা যে খবর পাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে যা দেখছে,তাতে পরিবেশ সন্তোষজনক। ছোট-বড় সব দলের পরামর্শ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নে য়া হচ্ছে।

এদিকে নির্বাচনের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোট গণনার নির্ধারিত সময়ের আগে ফলাফল জানার কোনো সুযোগ নেই।

এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টাল ভোটের ফলাফল সংক্রান্ত নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, পোস্টাল ব্যালট পেপার নির্বাচনের দিন বিকেল সাড়ে ৪টার পর নিয়মিত ভোট গণনার সময় একই সাথে গণনা করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়,উল্লিখিত সময়সীমার পূর্বে পোস্টাল ভোটের ফলাফল জানার কোনো আইনগত বা কারিগরি সুযোগ নেই। এ সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের আগাম তথ্য বা প্রচারণাই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। জনসাধারণকে এ ধরনের কোনো গুজব বা মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

ইসি আরও জানায়, যারা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে সামাজিক যো।গাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করতে সাইবার মনিটরিং টিম কাজ করছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়ালে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইসি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত দেশের ১১৬ সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিদেশ থেকে রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে দেশে এসেছে ১ লাখ ৭ হাজার ব্যালট। ইইউ পর্যবেক্ষকরা আসন্ন নির্বাচনে নারী, সংখ্যালঘু এবং সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। ইইউ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় উল্লেখ করে তারা নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে ইসির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

নির্বাচনকালীন অপতথ্য রোধে কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন পর্যবেক্ষণ বিষয়ে মেটার সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, এ প্রসঙ্গে নেটের স্পিড কমানোর কোনো প্রস্তাব নেই এবং সেটি সুপারিশও করা হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচনের আগে বর্তমান ইসি নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি। ফলে ফ্রেশার হিসেবেই এই দুটি ভোট একদিনে আয়োজন করতে যাচ্ছে। দুটি ভোট একদিনে আয়োজন ইসির জন্য বড় পরীক্ষা। এই দুটি বিষয়ের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের গলদ হলে সেটি ভোট গ্রহণ ও গণনাকে সংকটের মুখে ফেলতে পারে। এ কারণে গণনায় অপ্রত্যাশিত বিলম্ব হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেতে পারে। আর এই এক দিনে দু ভোট, ব্যালট ব্যবস্থাপনা ও গণনা ছাড়াও নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন এবং সামাজিক মাধ্যম ও এআই ব্যবহারজনিত চ্যালেঞ্জ কমিশনের সামনে বড় হয়ে উঠতে পারে ধারণা করছেন অনেকে।

ইসির চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে নির্বাচন সংস্থার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুজন সম্পাদক ড.বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির সামনে যেটা করণীয় সেটি হলো তাদের আইন-কানুন বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করা। কেউ যদি এসব অমান্য করে তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত গতিতে ব্যবস্থা নেয়া। তারা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে খুব কঠোরতা প্রদর্শন করতে পারেনি। যেমন তারা এই যে মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় প্যানেল তৈরি হওয়ার কথা, সেটি হয়নি।

তিনি বলেন, আইনের ব্যাপারে আরো কঠোর হতে হবে। একই সাথে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রশাসন কোনোরকম পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে। কারণ এখন তো প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে, ফলে তাদের এটা দেখার দায়িত্ব। তিনি বরেন, আইন রক্ষাকারী বাহিনী যাতে কোনোরকম পক্ষপাত না করে। এ ব্যাপারে তাদেরকে কঠোর হতে হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটা যাতে সঠিক হয়,যেমন এখন যাচাই-বাছাই চলছে, এ প্রক্রিয়া যেন কোনোরকম বিতর্কহীন হয়। এখানে যেন স্বচ্ছতা বিরাজ করে। নির্বাচন যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সে ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি থাকতে হবে।

সাবেক নির্বাচন সংস্কার ও ইনকোয়ারি কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন বিশ্লেষক ড.আবদুল আলীম বলেন, সংহিসতা ছাড়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অংশগ্রহণমূলক করতে পারাই হলো বর্তমান ইসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট-এটা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করার পরে ইলেকশন কমিশনের উচিত হবে, তাদের একটা ইভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়ন করা। যে দুইটা নির্বাচন তারা কিভাবে করল, কতটা সফল হলো, কতটা ভালো হলো, কতটা মন্দ হলো অর্থাৎ একটা সেলফ অ্যাসেসমেন্ট করা। নিজেদের বিশ্লেষণ নিজেরাই করা।

তিনি বলেন, আর তারপরে এবং তার ভিত্তিতে যে লার্নিংগুলো তারা পাবে তার ভিত্তিতে আগামী যে স্থানীয় নির্বাচনগুলো হবে সিটি করপোরেশন,পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ সব নির্বাচন কিন্তু হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কিভাবে সুন্দর করা যায়? ভালো করা যায় সেই দিকে ফোকাস করা।

তার মতে, দুই ভোট একই দিনে হবে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, অন্তত ৮০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ভোটার ভোট দিতে পারেন। এর মানে হলো ২০ কোটি ব্যালট গুনতে হবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সাত কোটি ভোটার ছিল। তাও গণনা শেষ হয়েছিল ভোটের পরদিন সকালে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে এবার সমস্যায় পড়তে হবে।

কমিশনের সামনে নতুন বছরে চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি বলেন, এ বড় দুটো নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এটার ওপরই তাদের আগামী নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতা আসবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এ জি