Home / চাঁদপুর / চলেই গেলেন অভিমানী শাহ মাকসুদ ভাই!

চলেই গেলেন অভিমানী শাহ মাকসুদ ভাই!

যাঁর হাত ধরে চাঁদপুরে অনেক সাংবাদিকের হাতেখড়ি, সেই শাহ মাকসুদ ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। অনেকটা অভিমান করেই যেন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মহান আল্লাহ এই গুণী সাংবাদিককে পরকালে ভালো রাখুক, এটিই সবসময় কামনা করছি।

একুশে টিভির চাঁদপুর প্রতিনিধি শাহ মো. মাকসুদুল আলম

২৮ সেপ্টেম্বর, সকাল ৯টায় চাঁদপুর শহরের তালতলা এলাকায় অবস্থিত নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, যমুনা টিভি’র জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক সংবাদ এর চাঁদপুরস্থ নিজস্ব বার্তা পরিবেশক শাহ্ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মাকসুদ ভাইয়ের যখন মৃত্যুর সংবাদ শুনি, তখন কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিল না! সবার প্রিয়, সাহসী এই সাংবাদিক এভাবে চলে যাবেন, তা মানতে কষ্ট হচ্ছিল।

ড. কামালের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন শাহ মো. মাকসুদ

গত ২৭ সেপ্টেম্বর, বেলা ১২টার দিকে যখন মাকসুদ ভাইয়ের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তাঁকে বিষণ্ন মনে একা ঘরের সামনে চেয়ারে বসে থাকতে দেখি। এ সময় সাথে ছিলেন আমার সহকর্মী টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সাধারন সম্পাদক রিয়াদ ফেরদৌস ভাই। দুইজনেই সাংগঠনিক কাজ শেষে ওই পথ দিয়ে ফিরছিলাম। এ সময় আমরা দু’জন দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ থাকা শ্রদ্ধেয় মাকসুদ ভাইয়ের সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করি।

২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাকসুদ ভাইয়ের সাথে পরিচয়। দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের সম্পাদক এর দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি অ্যাড. আবদুল হামিদের সাথে সাংবাদিক শাকসুদ

আমি তখন চাঁদপুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। পড়াশুনার মাঝে নিজেকে গণমাধ্যমে সম্পৃক্ত করার বাসনা জাগে। সেই চিন্তা থেকেই মাকসুদ ভাইয়ের সাথে দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহে কাজ করার সুযোগ হয়।

২০০৩ সালের শেষদিকে যখন মাকসুদ ভাই চাঁদপুর প্রবাহ থেকে বিদায় নেন, তখন পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে থেকে অনেক কিছু শিখার সুযোগ হয়েছে আমার। বয়সে নবীন হওয়ায় শুধুমাত্র সহকর্মী নয়, ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন।

যখন আমি এইচএসসি সম্পন্ন করে অনার্সে ভর্তি হই, তখন তিনি বিভিন্ন সময়ে পড়াশুনা ও পরিবারের খোঁজ-খবর নিতেন। বিশেষ করে গণমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি তিনি পড়াশুনার ব্যাপারে বেশ উৎসাহ যোগাতেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করছেন মাকসুদ।

পড়াশুনা ও গণমাধ্যমে একসাথে কাজ করার সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় মাকসুদ ভাই। এজন্য মাকসুদ ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়।

তিনি শুধুমাত্র আমার একজন গুরু কিংবা সহকর্মীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন উদীয়মান তরুণদের প্রেরণাদাতা, একজন দক্ষ অভিভাবক।

দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ থেকে মাকসুদ ভাইয়ের প্রস্থান হলেও, তাঁর সাথে আমার সবসময় ছিল যোগাযোগ। বিভিন্ন সময় তাঁর কাছে যেতাম, খোঁজ-খবর নিতাম। তিনি বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন।

দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিজের সম্পাদনায় ‘দৈনিক আমার চাঁদপুর’ নামে পত্রিকা বের করেন। অবশ্য আর্থিক সংকটে সেই পত্রিকা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি এই পেশাদার সাংবাদিক। বছর দু’য়েক পত্রিকাটি চালানোর পর বিক্রি করে দেন।

আন্তর্জাতিক ফোরামে সংবাদ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন শাহ মো. মাকসুদ

মাকসুদ ভাইয়ের পাশে থেকে কাজ শিখার সুযোগ হয়েছে আমার। বলতে গেলে হাতে-কলমে কাজ শিখিয়েছেন তিনি। সঠিক বানানে নিউজ লেখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব সতর্ক। দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহে যাঁদেরই কাজ করার সুযোগ হয়েছে, বলতে গেলে প্রত্যেককে তৈরির কারিগর বা শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় মাকসুদ ভাই।

মাকসুদ ভাই সবসময় বলতেন, “ভালোভাবে পড়াশুনা করেন। শুধু ‘পাশ’ করলেই হবে না! ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তাহলেই আপনারা ভালো সাংবাদিক হতে পারবেন। ভালো সাংবাদিক হতে হলে, পড়াশুনার বিকল্প নেই। সুযোগ পেলে, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের জীবনী সম্পর্কিত বই পড়বেন। অনেক কিছু জানতে পারবেন।”

পত্রিকার পাশাপাশি প্রথমে একুশে টিভি ও পরবর্তীতে যমুনা টিভিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। টিভি সাংবাদিকতায় মাকসুদ ভাই তাঁর সহকর্মীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ভালো মানের সংগঠকও। চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কর্মরত সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে প্লাটফর্ম গড়েন তিনি।

২০০৬ সালে তৎকালীন সময়ে শ্রদ্ধেয় মাকসুদ ভাই, সদ্যপ্রয়াত ইকরাম চৌধুরী, গোলাম কিবরিয়া জীবন, পার্থনাথ চক্রবর্তী, জি এম শাহীনসহ কয়েকজনের সমন্বয়ে টিভি সাংবাদিকদের একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন। কিন্তু ওই সময় হাতেগোনা কয়েকজন সাংবাদিকের পক্ষে ওই সংগঠনটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে সময়ের ব্যবধানে ২০০৯ সালে সাংবাদিক শরীফ চৌধুরী ও সাংবাদিক রহিম বাদশা টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলায় কর্মরত টিভি সাংবাদিকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন। যা বর্তমানে ‘চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম’ নামে সর্বমহলে টিভি চ্যানেলে কর্মরত সাংবাদিকদের একটি জনপ্রিয় শক্তিশালী প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

শ্রদ্ধেয় মাকসুদ ভাইয়ের সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুবাদে তাঁর সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। এই স্বল্প স্মৃতিচারণে যা বলে শেষ করা সম্ভব নয়।

স্মৃতিতে একটি কথা আমার মনে পড়ছে। বিশেষ করে মাকসুদ ভাই যখন দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ-এর সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন, তখন তার হাত ধরে নারী সাংবাদিকতার আবির্ভাব ঘটে। এই সময় ‘রাখী সাহা’ নামের এক নারীকে সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

২০১৭ সাল, স্মরণীয় একটি বছর। এ সময় আমি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কর্মরত সাংবাদিকদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন ‘চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম’ এর সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন শুরু করি। বলতে গেলে সর্বকনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে এই ধরনের প্লাটফর্মে দায়িত্ব পাওয়া আমার জীবনে একটি বড় ঘটনা।

দড়দড়ম

এক্ষেত্রে, সদ্যপ্রয়াত ইকরাম চৌধুরী, সদ্যপ্রয়াত শাহ্ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম, শ্রদ্ধেয় গোলাম কিবরিয়া জীবন, পার্থনাথ চক্রবর্তী, টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শরীফ চৌধুরী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক রহিম বাদশা, সাবেক সাধারন সম্পাদক জি এম শাহীন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রিয়াদ ফেরদৌস, আলম পলাশ, ফারুক আহম্মদ, হাবিবুর রহমান খান, ল²ন চন্দ্র সূত্রধর, সোহেল রুশদী, মুনাওয়ার কানন, রফিকুল ইসলাম বাবু, কাদের পলাশ, ওয়াদুদ রানা, নাছির উদ্দিন পাঠান, খুরশিদ আলম, ইব্রাহিম রনি, নেয়ামত হোসেন, তালহা জুবায়ের, আবদুল আউয়াল রুবেল, বোরহান উদ্দিন ডালিম, মোরশেদ আলম রোকনসহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

সংগঠনের নেতৃত্বে সুবাদে ওই বছরই আমরা বান্দরবন ও কক্সবাজার ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেই। ভ্রমণে মাকসুদ ভাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে এই ভ্রমণে মাকসুদ ভাইয়ের অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি আমাদের সবসময় খোঁজ-খবর নিতেন এবং উৎসাহ দিতেন।

পরবর্তীতে আমরা যখন ২০১৮ সালে দেশের বাইরে আগরতলা ও কলকাতা ভ্রমণের আয়োজন করা হয়, তখনও মাকসুদ ভাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেশের বাইরে ভ্রমণের কথা শুনে, তিনি প্রথমদিকে বেশ আগ্রহ দেখান। পরবর্তীতে তিনি হাস্যোজ্জ্বলে বলেন, ভাই, আমি তো অসুস্থ। আমার পক্ষে জার্নি করা সম্ভব না। আমি আপনাদের সাথে গেলে, আপনাদের ভ্রমণে বিপত্তি ঘটবে। বরং আপনারা যান, আপনাদের প্রতি দোয়া রইলো।

এরপর ২০১৯ সালে যখন আবারও টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের পক্ষ থেকে ভারত ভ্রমণে যাওয়া হয়, তখনও মাকসুদ ভাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য! শারীরিক অসুস্থতা থাকায়, ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও মাকসুদ ভাইয়ের ভ্রমণে যাওয়া হয়নি।

চাঁদপুর স্টেডিয়ামে শাহ মো. শাকসুদুল আলম

মাকসুদ ভাই, বেশ কয়েক বছর যাবত শারীরিক অসুস্থতা থাকায় তাঁর সাথে কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে সংগঠনের ভ্রমণ কিংবা সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি বিভিন্নভাবে আমাদেরকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতেন।

মাকসুদ ভাইয়ের মৃত্যুতে যেই শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবে পূরণ করা সম্ভব নয়। পরকালে ভালো থাকবেন আমাদের শ্রদ্ধেয় মাকসুদ ভাই, এই কামনা মহান আল্লাহ পাকের কাছে।

লেখক : আল ইমরান শোভন : সভাপতি, চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম; বার্তা সম্পাদক : দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ; চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি : চ্যানেল টুয়েন্টিফোর, দৈনিক যায়যায়দিন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

ইন্টারনেট কানেকশন নেই