Home / সারাদেশ / যৌতুকের বলি লিজার পায়ে যখন শিকলের বেড়ি

যৌতুকের বলি লিজার পায়ে যখন শিকলের বেড়ি

কেউ বলছে জ্বিনে আছর করেছে, কেউবা বলছে ভূতে ধরেছে। আবার কারো কারো দাবি ঘরের ভিতরে এবং বাইরে দুইটা জ্বিনই তাড়া করছে তাকে।

কখনও তিনি পুকুরে ঝাঁপ দেন, হঠাৎ দৌড়ে অন্য বাড়িতে চলে যান, কখনো বা মানুষ দেখলেই উত্তেজিত হন। অসংলগ্ন এসব আচরণের কারণে প্রতিবেশীদের ধারণা লিজা আক্তারকে জ্বিনে ধরেছে।

লিজার বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার সীমান্তবর্তী আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের খাসের হাওলা গ্রামে। পরিবারের সামর্থ না থাকায় এবং প্রতিবেশীদের নানা মন্তব্যের কারণে লিজাকে জ্বিন এবং ভূত তাড়ানোর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। মাঝে মধ্যে তার পায়ে পরিয়ে দেয়া হয় লোহার শিকল।

বড় বোন সেলিনা বেগম জানান, অভাবের সংসার তাদের। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট লিজা। ছোট বেলা থেকেই লেখাপড়ায় বেশ মনযোগী ছিল লিজা। এ কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে দেয়া হয়নি কোনো ধরনের বাধা। নিজের চেষ্টা আর পরিবারের উৎসাহে মাদরাসাবোর্ডের অধীনে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট অর্জন করেন। বর্তমানে স্থানীয় মহাসেন উদ্দিন ফাজিল মাদরাসায় ডিগ্রিতে পড়ছেন লিজা।

গত তিন মাস আগে স্থানীয় আলী মোল্লার ছেলে মো.ফিরোজ মোল্লা লিজাকে বিয়ের জন্য বাড়িতে প্রস্তাব পাঠায়। দুই পরিবারের পছন্দে বিয়ের কথা চূড়ান্ত হয়। কিন্তু বিয়ে হওয়ার কিছু দিন আগে ফিরোজ দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এতো টাকা দেয়ার সামর্থ নেই লিজার পরিবারের। ফলে বিয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

বিয়ের জন্য পুরুষের অর্থ লোভ এবং কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পরও বিয়ে না হওয়ার বিষয়টি লিজাকে বারবার ভাবিয়ে তোলে। এ ভাবনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মাঝেমধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পুকুরে ঝাঁপ দেন। হঠাৎ দৌড়ে অন্য বাড়িতে চলে যান, আবার মানুষ দেখলে উত্তেজিত হন।

এছাড়াও নানা ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করেন। তাই লিজাকে আটকে রাখার জন্য পায়ে পরিয়ে দেয়া হয় লোহার শিকল। কখনো ঘরের মধ্যে খুঁটির সঙ্গে কখনও আবার বাড়ির গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় তাকে। যখন স্বাভাবিক আচরণে ফিরে আসেন তিনি তখন খুলে দেয়া হয় শিকলের বাঁধন।

লিজার বাবা ইউনুছ হাওলাদার মারা গেছেন চার বছর আগে। দুই ভাই মো. বাবুল হাওলাদার ও মজিবুর রহমান হাওলাদার দিনমজুরির কাজ করে তাদের সংসার চালান। অপরদিকে, বড় বোন সেলিনা বেগমের স্বামী ও এক সন্তান সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর ওই বোনও আশ্রয় নিয়েছেন ভাইদের সংসারে। এমন অভাবের সংসারে লিজাকে শহরে নিয়ে চিকিৎসা করানো ভাইদের জন্য খুবই কষ্টকর। তাই প্রতিবেশীদের কথা অনুযায়ী স্থানীয় কবিরাজ এবং ওঝা দিয়ে জ্বিন বা ভূত ছাড়ানোর চিকিৎসা চলছে লিজার।

বুধবার লিজার সঙ্গে কথা হয় তাদের বাড়িতে। এ সময় লিজাকে সুস্থ এবং স্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা গেছে। লিজা বলেন, ‘আমি তো ভালো ছিলাম। আমি এখনও লেখাপড়া করি। মাদরাসায় যেতে চাই। কিন্তু মাঝেমধ্যে কি যেন হয়ে যায়। স্বাভাবিক আচরণ থেকে অস্বাভাবিক আচরণ করি। এ কারণে আমাকে মাদরাসায় যেতে দেয় না। আমি সুস্থ হতে চাই, লেখাপড়া করতে চাই। ফকির আর কবিরাজ ওষুধ দিয়েছে, তা আমি নিয়মিত খাই। কিন্তু সুস্থ হই না। আমি শিকলের জীবন থেকে মুক্তি চাই।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক মেজর অবসরপ্রাপ্ত ডা. আব্দুল ওহাব মিনার বলেন, ‘অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে এমন হতে পারে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় অনেক রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়। বর্তমানে লিজার চিকিৎসা করলে তিনি সুস্থ না হলেও অবস্থার উন্নতি হবে। এ সব রোগীদের ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে জ্বিনের আছর সম্পর্কিত যে অপপ্রচার রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। অজ্ঞতার কারণে গ্রামাঞ্চলে ঝাঁড়-ফুক দেয়া হয়। এতে এসব রোগীদের কোনো উন্নতি হয় না বরং আরো অবনতি হয়।’

চাঁদপুর টাইমস নিউজ ডেস্ক || আপডেট: ০১:০৩  পিএম, ১০ অক্টোবর ২০১৫, শুক্রবার

ডিএইচ/২০১৫।