Home / চাঁদপুর / কবি ও লেখক ডা. পীযূষ কান্তির বড়ুয়ার জন্মদিনে একগুচ্ছ কবিতা
pijus-kanti

কবি ও লেখক ডা. পীযূষ কান্তির বড়ুয়ার জন্মদিনে একগুচ্ছ কবিতা

আশিক বিন রহিম:
কবি ও লেখক ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়ার ৪৫ তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৯৭৩ সালের ১০ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরণদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সুরেশ চন্দ্র বড়ূয়া, মাতা পাখি রাণি বড়ূয়া।

ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া কবিতার পাশাপাশি ছোট গল্প, উপন্যাস, ছড়া ও গান, প্রবন্ধ-নিবন্ধসহ সহিত্যেরর প্রায় প্রায় প্রতিটি শাখাতেই দক্ষতার সাথে বিচরণ করছেন। শুধু তাই নয়, একজন দক্ষ সংগঠক এবং বিতর্কের শিক্ষক হিসেবেও চাঁদপুরে তাঁর অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। চিকিৎসক হিসেবে এ জেলায় তাঁর সুপরিচিতি রয়েছে। তিনি একজন ভালো উপস্থাপক।বর্তমানে তিনি কেয়ার এন্ড কিওর কন্সালটেশন সেন্টার নিয়মিত চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন।

তিনি চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কবিতার কাগজ তরী’র প্রধান উপদেষ্টা, চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্ঠা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন সাহিত্যে ও সামাজিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

ডা. পীযূষ কান্তি বড়ূয়ার এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০টি। গ্রন্থগুলো হলো:
১-তোমার নিবীতে অন্য কেউ (কাব্যগ্রন্থ), ২- সায়নালোকে এক জীবনের সন্ধ্যায় (উপন্যাস), ৩-ঘুমের মধ্যে লীলা আসে (উপন্যাস), ৪- প্রজ্ঞা-প্রসূন (প্রবন্ধ সংকলন), ৫- কল্প-কুসুম (ছোটগল্প সংকলন), ৬ ইলিশের বাড়ি (ব্র্যান্ডিং ছড়াগ্রন্থ), ৭ আমার মায়ের সুচিকিৎসা চাই (কবিতাপত্র), ৮-বিতর্ক বিধান (সনাতনী বিতর্ক বিষয়ক গ্রন্থ), ৯-বিতর্ক বীক্ষণ (সনাতনী বিতর্ক বিষয়ক গ্রন্থ), ১০- ব-দ্বীপ হতে বাংলাদেশ (কিশোর কাব্যগ্রন্থ)।

সোহিত্যকর্মের স্বিকৃতী সরূপ তিনি পেছেয়েন: জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ প্রতিযোগিতায় প্রবন্ধে স্বর্ণপদক (১৯৮৯), স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক-দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ শীর্ষক দেশব্যাপী লিরিক্স প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর পুরস্কার, চতুরঙ্গ সম্মাননা। । ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া জেলা ব্র্যান্ডিং প্রকাশনার গ্রন্থিত ছড়াকার ও জেলা উন্নয়ন মেলা থিম সং এর গীতিকবি। তিনি চাঁদপুর সাহিত্য সম্মেলন ও পদক্ষেপ বাংলাদেশ আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইলিশ উৎসবের প্রবন্ধ রচয়িতা।

কবির জন্ম দিনে চাঁদপুর টাইমসের পঠাকদের জন্য প্রকাশ করা হলো কবির স্বরচিত একগুচ্ছ কবিতা।

জীবন এক পাইথন

বুকে হেঁটে গড়ানো দিন
আস্ত পাইথন যা পায় গিলে খায়
আঁধারের অনিদ্রিত রাত চুয়ে
সদ্যোজাত ঊষাকে হননে চোখ
ক্রমশঃ তারপর অতল পেটে গেছে
সম্ভাবনার সকাল আশার রোদেলা দুপুর
বিনোদিনী কোমল বিকেল।

প্লবগ দিন এক আস্ত পাইথন
সব আলো চুমুকে পান করে
ঝুপ করে টেনে আনে রাত
সন্ধ্যার অকাল মৃত্যু।

অজস্র পাইথনে সঙ্কুল মর্ত্য-জীবন
গিলে নেয় করুণা আর মৈত্রী,মমতা আর সম্প্রীতি
আশার ক্ষয় আয়ুর ক্ষয়
অতীত ও অনাগতের ক্ষয়
জীবন এক বুভুক্ষু পাইথন
আস্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে গিলে খায় আস্ত মানুষ।

জীবনের উৎখনন

সময়ের অতল সমুদ্র চষে
ডুবুরীর দক্ষতায় ডুবতে ডুবতে একদিন
পেয়ে যাই অমূল্য রতন
সে আমার আরাধ্য শৈশব
বিধি-নিষেধের সীমানা-জালক ছিঁড়ে
কচি সবুজ প্রাণের নির্মল মূর্চ্ছনা।

জীবনের তরী বেয়ে হাজার দ্বীপের শেষে
পেয়ে যাই একদিন মনোরম আবাসভূমি
অথৈ বিস্তীর্ণ নীল জলের মাঝে
নাটোরের নীড়চোখা নারীর শরীর
অতুল কৈশোরের আদিহীন চারণভূমি
যার প্রতিটি কণায় উৎকীর্ণ আছে দূরন্তপনা।

প্রথম প্রভাতের কোমল রোদ্দুর কমলা হয়ে
গাঢ় হতে হতে হয়ে যায় তীব্র দ্বিপ্রহর
যৌবন পেরুনো জীবনের মধ্যভারে বিচলিত মগ্নতায়
আজও ফুলে ফুলে প্রজাপতি ওড়ে
নিবিড় দূরন্তপনায় মগ্ন বালক
ভুলে থাকে গৃহের পথ।

পথ ও পথিক

চওড়া-সরু,দীর্ঘ-হ্রস্ব,বঙ্কিল বা সোজা
পথ আছে অজস্র, হরেক কিসিমের
পথের এই বাজারি সমাহারে
সব পথ পথিকের নয়, সব পথিকও পথের নয়
পথ দৃশ্যমান,পথ অদৃশ্য

পথ ভ্রমণের,পথ দমনের
পথ গ্রহণের,পথ বিসর্জনের
হাঁটলেই পথিক হয় না
না হেঁটেও পথিক হওয়া যায়
হাঁটতে হাঁটতে যে ঘুরে আসে হাজার বছর
সে তো পথিক নয়,পথিকের গন্তব্য থাকে
গন্তব্যহীন পথিক হয় না

পথের গন্তব্য নেই,পথ বাহনের মতো
পথিকই পথ নিয়ে গন্তব্য দেখায়
পথ ও পথিক সফলতার পূর্ব প্রেম
পথ ও পথিক একে অপরের আশ্রয়।

জীবনের জয়গান

জীবনের কালজয়ী জলযানে
মেঘনার কোলে কোলে বুড়িগঙ্গার পায়ে
জলপথে যাত্রার বাহারি মোড়কের পরতে পরতে
জলজীবীর মগ্ন সংগ্রাম
মন ও মননের নিদ্রিত কানে জীবনের জয়গান ।

মুঠোতে ফোনের আদলে জীবন
উপোসী জলজীবীর জলজ ফসলের বুভুক্ষা
অতীশের জনপদে চলমান জলযানে
জীবন-বাজি প্রাণের মাঝ-নদী সওয়ার
বাঁচার মাধুর্য সন্ধানী
প্রাণের অন্তর-তারে মীড়ের মকশো
কালজয়ী জলযানে সওয়ার বিকেলে
গোধুলির আকাশে রঙের উৎসব

যেনো লীলাসখার মান ভাঙানো নিশিকন্যা
সন্ধ্যার কলা-কেলিতে আঁধারে মুখর
নিষিদ্ধ পল্লীর পাল্টানো নামের মাধুরী-মীনাক্ষী
কালজয়ী জলযানে জলের কলতানে কতোলীলা
কালের মূদ্রায় উৎখনিত পলে পলে !

কখনো সফেদ ফেনার জলে উছলানো নীড়-চোখ
কখনো মেঘবালিকা রাগরাঙা অভিসারে অসীম নীলে
মুঠোতে জীবন-মরণ সংগ্রামে ইষ্ট শরণ
তবুও মুগ্ধ নয়ান অবাক জলজীবীর জীবনের জয়গান।

রূপান্তর

নগরের শিরা-স্নায়ু -জালকের ভিড়ে
বিদ্যুতের খুঁটির তারে একাকী শালিক
আদিপিতার নৈঃশব্দে নিবিড় জরীপ
কাল-গর্ভ শহরের যন্ত্র -নিবীত ।

ডোবা-খাল-জলাশয় -শিয়ালের হাঁক
ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গল-প্রাণের জগৎ
তারপর ধীরে ধীরে জলায় বালি
অরণ্য তরুহীন মরুর বরাত
অনিকেত বনের হৃদয় উজাড় সবুজ
কালে কালে দানবের করাল থাবা
ভেঁপুর শিঙায় মূক পাখির কূজন
মাটির উপরে পিচ্ রক্তচোষা
দালানের খোপে খোপে কালের মমি
যন্ত্রের মন তার মাংসে শরীর
শ্রবণের শক্তি হ্রাস পাষাণ শোভায়
জীবনের দামে বুকে কলের হাওয়া ।

কালের খুঁটির তারে মনের শালিক
গভীর নিঃশ্বাস তার নিটোল জরীপ
কালের ধোঁয়ার ডানায় তৃষিত নগর
আধুনিক ইমারতে নিহত সম্বিৎ ।

অমর্ত্য

জীবনের পরিণাম অজ্ঞাত জেনে
প্রতিদিন যে প্রতীক্ষায় থাকে মৃত্যুর
বেঁচে থাকা তার কাছে প্রমিথিউসের মতো
ঈগলের ছোবলে বিক্ষত দেহ নিয়ে
সূর্যের গলানো তাপে ঝলসানো ত্বকে
দিনভর প্রতীক্ষা রাত নামার।

জীবনের ইহকাল -পরকাল জেনে
প্রতিদিন যে পথ চলে পরিমিতি নিয়ে
বাঁচার আনন্দ তার কাছে মায়ামৃগ
নিঃশ্বাস তার কাছে দীঘল দেহের ছায়া
দেহান্তর জীবনের সে অন্ধ মোহে ভোগে
পরকালে ফিরে পেতে লোকোত্তর অঢেল সম্ভার।

জীবনের অনাদি অন্তহীন রূপের মায়ায়
যে কবি ঘুরে বেড়ায় নিঃশ্বাসে প্রজাপতি নেচে
জীবনের এই আয়োজন তার প্রাণের স্পন্দন
মরে না সে বেঁচে থাকে কালের ছায়ায় ।

১০ অক্টোবর, ২০১৮

শেয়ার করুন