Home / আরো / ফিচার / বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ
Sekh Mujibur Rahaman

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

আজ ১৭ মার্চ । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯ তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস । নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯ তম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে। ১৯৪৭ সালের আগ থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃত এবং বাঙালি জাতির এক অবিসংবাদিত নেতা। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন , চোয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠন, আটান্নর সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন ,ছিষর্টির ৬-দফা ,ঊনসত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের গণ আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন সহ এদেশেল সাধারন মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণে প্রতিটি আন্দোলনে-সংগ্রাম এ জাতিকে নেতৃত্ব দেন। এজন্য তাঁকে বার বার কারাবরণ সহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়।

তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক এবং অবিচ্ছেদ্য। যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। বাংলার স্বাধীনতা, ভাষা , সমাজ ,সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্য বঙ্গবন্ধু চিরকালের জন্য চির জাগ্রত। তিনি জাতির জনক এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, চেতনা ও অধ্যায়।

যার জন্ম না হলে হয়তো আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেতাম না। তাঁকে ১৯৭৫ সালে কিছু বিপদগামী সেনা কর্মকর্তা নৃশংসভাবে হত্যা করে। বাঙালি জাতির জন্য একটি দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় যে ছেলেটির জন্ম, সেই ছেলেটি একসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর ছিল দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন।

মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, জেল খেটেছেন; কিন্তু কখনও দমেননি। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বাঙালি জাতিকে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ উপহার দেয়ার প্রত্যয়ে প্রথিত ছিল। কিন্তু তাঁকে হত্যা করা হয় এবং পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা হয়। আজকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন।

শৈশব থেকে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বীজ নিহিত ছিল। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সোচ্চার ও সচেতন। তিনি যখন মিশনারি স্কুলে পড়তেন, তখনই ছাত্রাবাসের দাবি স্কুলছাত্রদের পক্ষ থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছিলেন, যা সত্যিই বিরল ও রাজনৈতিক চেতনার একটি শুভ লক্ষণ।

কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তির বছরেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা মেনে নেবে ‘ বলে ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু এর প্রতিবাদ জানান।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকা আসেন এবং দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারি এ জাতীয় দলে যোগদানের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। স্বাধীনতাকে তাই স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে ঢেলে সাজান।

স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা দেন, যার লক্ষ্য ছিল- দুর্নীতি দমন, ক্ষেত-খামারে ও কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্যে দ্রত অগ্রগতি সাধিত করার মানসে ৬ জুন বঙ্গবন্ধু সব রাজনৈতিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী মহলকে ঐক্যবদ্ধ করে এক মঞ্চ তৈরি করেন, যার নাম দেন বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু এই দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে অভূতপূর্ব সাড়া পান। অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। চোরাকারবারি বন্ধ হয়। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে। নতুন আশার উদ্দীপনা নিয়ে স্বাধীনতার সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে। মানুষের সে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না।

বঙ্গবন্ধুর গোটা জীবন কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের নেতা। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পন্ন হয়। একজন ছাত্রনেতা, সফল রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। মানুষের ওপর আস্থা অর্জন করার মতো মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তিনি সবসময় একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান একত্রে বসবাস করবে পারস্পরিক সম্প্রীতির মাধ্যমে। পাশাপাশি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার চিন্তা-চেতনা তাঁর মধ্যে ছিল। একটি রাষ্ট্রের জনসাধারণ যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ওপর হস্তক্ষেপ করবে না।

ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করা বা রাজনৈতিক দল গঠন করায়ও তিনি ছিলেন বিরুদ্ধ। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেন, যা ছিল তাঁর দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক দর্শনের পরিচায়ক।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা। এ উপলব্ধি থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নের জন্য যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন, কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নের পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন।

তিনি বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন, যেখানে সরকার ও জনসাধারণ যৌথ উদ্যোগে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। সমবায় ব্যবস্থার প্রচলন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি অন্যতম দিক। একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা উপহার দেওয়াই ছিল তাঁর পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন। সমাজতন্ত্র কায়েম করাও ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের আর একটি দিক।

বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সাধনা ছিল শোষণহীন সমাজ গঠন, যেখানে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকবে না, যেখানে প্রতিটি মানুষ জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন আহার, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সুযোগ পাবে। সারাবিশ্বে বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্তাকে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে তিনি চেয়েছিলেন। আর সে লক্ষ্যে সারাজীবন ত্যাগ, তিতিক্ষা করেছেন, আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেছেন।

ফাঁসির দড়ি তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি। তাঁর এই আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য আদর্শস্বরূপ। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুর স্বনির্ভর ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার এবং কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের বিশ্বের দরবারে পরিচিত করার সময়। বঙ্গবন্ধু একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। দেখতেন এ দেশের প্রতিটি মানুষ খেয়ে-পরে থাকবে।

স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিক্রম করার পরও আমরা সেই স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হইনি সত্য; তবে বর্তমান সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনকে বাস্তবায়ন করতে পারবে। এতে বঙ্গবন্ধুর আত্মাও শান্তি পাবে।

বার্ত কক্ষ
১৭ মার্চ, ২০১৯