Home / বিশেষ সংবাদ / প্রিয় কবি নজরুলের প্রণয় : নজরুল-নার্গিস

প্রিয় কবি নজরুলের প্রণয় : নজরুল-নার্গিস

মানুষের জীবনে প্রেম-প্রীতি,রাগ-অনুরাগ, ভালোবাসা,বিরহ ,মায়া ও মমতা হলো সহজাত বৈশিষ্ট্য। আমাদের প্রিয় কবিও মানুষ হিসেবে এসব গুণাগুণের অধিকারী থাকাই স্বাভাবিক। তবে তাঁর জীবনের প্রণয়ের ঘটনাগুলো কত যে বেদনাবিধূর তা’বলার অপেক্ষা রাখেনা। কবিতার মাধ্যমে স্বদেশ প্রেম ও ভালোবাসার দৃপ্ত শপথে তিনি ছিলেন আপোসহীন। প্রেয়সীর প্রেম নিবেদনেও ছিলেন বিন¤্র বিনিত।তাঁর প্রেমের উপাখ্যানে সফলতা ও ব্যর্থতা দু’টোই ছিল।

প্রিয় কবির প্রেম-বিরহের বিষয়টিই ছিল ভিন্নতর।প্রেম-ভালোবাসার বিষয়গুলোর তাঁর কোনো কোনো কাব্য রচনার বিষয়বস্তুগুলোতে বিভিন্ন মিল রয়েছে বলে নজরুল গবেষকদের লেখনিতে পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলেছেন-কবির জীবনে প্রেম বিরহ না ঘটলে এতো কবিতা হয়তো লিখতে পারতেন না ।

নজরুল- নার্গিস

কবি কাজী নজরুলের জীবনে প্রেয়সীর প্রণয় যেমন তাঁর হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করেছে ঠিক তেমনি মহীয়ান হতেও সহায়তা করেছে। নারীর প্রতি প্রেম, ভালোবাসা,নারীর প্রত্যাখ্যান,নারীর বিরহ-বেদনা নজরুলের সাথে যেসব রমনীদের প্রেম-ভালোবাসা গড়ে উঠেছিলÑতাঁদের বিষয়গুলোকে বাদ দেয়া যায় না। তাদের নিয়েই তাঁর অনেক রচনা।

প্রিয় নজরুল দৌলত পুরে নার্গিসদের বাড়িতে অতিথি থাকাকালীন প্রায় ৪১ দিনে ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতাই লিখেন্।এদের মধ্যে-কুমিল্লায় দৌলতপুরের সৈয়দা আসা খাতুনওরফে নার্গিস,কুমিল্লা কান্দিরপাড়ের ইন্দোকুমারের ভাতিজি ও বসন্তকুমার-গিরিবালার মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেছা ওরফো জোহা। ঢাকায় গানের ছাত্রী প্রতীভা বোস ওরফে রানু সোম,ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষের মেয়ে উমা মৈত্র,জাহানারা বেগম চৌধুরী ও কানন দেবী প্রমুখদের সাথে প্রণয়ঘটিত কিছ’ নেই-যা বলা হয়েছে তা হয়েছে তৎকালীন প্রভাগান্ডা বা মিথ্যা রটনা ।

১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে নজরুলের প্রণয়ের প্রথম বিয়োগায়ন্তক বিষয়টি অবতারণা শুরু কুমিল্লার দৌলতপুরের সৈয়দ আসা খাতুন ওরফে নার্গিসকে নিয়ে। নজরুলের জীবনের প্রণয়ের নানাবিধ দিক তাঁকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে। সৈয়দা আসা খাতুন ওরফে নার্গিসের সাথে নজরুলের প্রেম, বিরহ ও বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়টির বেদনাবিধূর ও করুণ অধ্যায় রচিত হয়েছে। ফলে কবির হৃদয়ের ভেতর বড় আঘাত লেগেছে। কবি নজরুলের অকৃত্রিম বন্ধু কলিকাতার পুস্তক ব্যবসায়ী, প্রকাশক ও একজন নাট্যকার হিসেবে পরিচিত আলী আকবর খান।

তার সাথেই দীর্ঘদিনের পরিচয় সূত্রে ও বন্ধুত্বের নিবিড়টানে ও আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম তার দৌলতপুর গ্রামের বাড়ি বেড়াতে আসেন। সময়টা ছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দ ২ চৈত্র। এখানে তিনি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ় পর্যন্ত অতিথি হিসেবে ছিলেন। সে বাড়িতে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২২ বৈশাখ আলী আকবর খানের বিধবা বোনের মেয়ে তারই ভাগ্নি একই গ্রামের বাসিন্দা মুন্সি আবদুল খালেক ওরফে আবু মুন্সির কন্যা ছিলেন সৈয়দ আসা খাতুন। তার খালার নাম ছিল এখতারুন নেছা যাকে প্রিয় কবি মায়ের মতই জানতেন।

তার সাথে নজরুলের প্রথম পরিচয় ঘটে আলী আকবর খানের বড় ভাইয়ের মেয়ের এক বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন। সৈয়দা আসা খাতুন ঐ বিয়েতে গান গেয়েছিলেন।

সৈয়দা যেমনি সুন্দরী তেমনি অনেক গুণের গুণান্বিতা ছিলেন। তার মামাদের আদর,স্নেহ ও ভালোবাসায় সে বড় হয়ে উঠে। ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২৯ বৈশাখ প্রথম দেখার পরই নজরুল সৈয়দার প্রেমে পড়ে যান। তাঁদের মধ্যে প্রেমের ঘনিষ্ঠতা দিন দিন বাড়তেই থাকে। ঠিক এমন এক মুহুর্তেই কবি নজরুল তাঁর প্রিয় পারস্যের কবি হাফিজের প্রিয়‘ফুল নার্গিসের’নামানুসারে সৈয়দ আসা খাতুনের নাম রাখেন‘নার্গিস’। Nargis-..

নজরুলের সাথে নার্গিসের বিয়ে তখনও হয়নি। বিয়ের আগেই তার এ নাম রাখেন প্রিয় কবি নজরুল। নার্গিসও সুদর্শন, সুপুরুষ ও উদীয়মান কবি নজরুলকেও মনে প্রাণে ও হৃদয় দিয়েই ভালোবাসে ফেলেন। দু’জনের দু’টো মনই উজাড় হয়ে যায প্রেমডোরে । এ ভাবে বেশ কিছুদিন চলতে থাকে তাঁদের প্রেমের রাগ-অনুরাগ।

এ সময় নার্গিসকে নিয়ে কবি বেশ কিছু গান ও কবিতা লিখেন কবি। নজরুলের সাথে নার্গিসের বিয়ের ব্যাপারে তার অভিভাবকদের মধে অনেকেই রাজি ছিলেন না। এক পর্যায়ে তারা সম্মত হন এবং বিয়ের দিন তারিখ ধার্য করেন।

এদিকে উল্লেখ্য যে, আলী আকবর খানের মাধ্যমেই প্রথম কবি কুমিল্লা এসে বিরজা সুন্দরীর পরিবারের সাথে পরিচয় ঘটে। কুমিল্লার কান্দির পাড়ের সেন পরিবারের সাথে প্রথম দেখার পর পরই ঘনিষ্ঠত বাড়ে। নজরুল এ পরিবারের ইন্দোকুমার সেনের স্ত্রী বিরজা সুন্দরীকে পরিচয়ের শুরু থেকেই ‘মা’ বলে ডাকতেন। তাই সম্ভবত :বিয়ের আগের দিন কুমিল্লা সেন পরিবার থেকে ইন্দ্রকুমার সেন ও তার পুত্র বীরেন্দ্র কুমার,বিরজা সুন্দরী ও তার বড় ভাইয়ের বউ বসন্ত কুমারের বিধবা স্ত্রী বাধন বা দুলি বা প্রমীলার মা গিরিবালাও উপস্থিত ছিলেন ঐ বিয়ের রাত। কথাবার্তা ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের মোটামুটিভাবেই বিয়ের কর্ম সম্পন্ন হয়।

কিন্তু বিয়ের পরপরই নার্গিসকে নিয়ে নজরুলের কলকাতায় থাকা নজরুলের পক্ষে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল না বলে সাময়িকভাবে নার্গিস-নজরুল একত্রে দৌলতপুরেই থাকার বিষয়টি খোলাখুলিভাবে আলোচনার বিষয়বস্ততুতে চলে আসে। কিন্তু কেউ কেউ মনে করত যে নজরুলকে ঐ বাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে রাখার একটা মতলব চলছে এবং এতে কথা কাটা কাটি হয়।

এটা মনে করেই পরের দিন ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৪ আষাঢ় ভোরবেলা নার্গিসের চোখের পানি উপেক্ষা করেই কবি ও গিরিবালার পরিবার পরিজন কুমিল্লার উদ্দেশ্যে দৌলতপুরের নার্গিসদের বাড়ি ত্যাগ করে চলে আসেন। এটাই হলো শেষ আসা। কবি আর কোনো দিন নার্গিসের বাড়ি যায় নি এবং তার সাথে কোনো দিন দেখাও হয়নি। এর ফলে নজরুলের সাথে নার্গিসের দাম্পত্য জীবন যাপনও সম্ভব হয়নি। কবি নজরুলের দৌলতপুর ছেড়ে আসার প্রায় ১৫ বছর পর ১৯৩৮ সালের ১ ডিসেম্বর নার্গিসকে প্রিয় কবি একটি হৃদয় বিদারক চিঠি লিখেন …

‘ জীবনে তোমাকে পেয়েও হারালাম। তাই মরণে পাব-সে বিশ্বাস ও সান্তনা নিয়ে বেঁচে থাকব। প্রেমের ভূবনে তুমি বিজয়িনী,আমি পরাজিত। আমি আজ অসহায়। বিশ্বাস করো-আমি প্রতারণা করিনি। আমাদের মধ্যে যারা দূরত্বের সৃষ্টি করেছেÑপরকালেও তারা মুক্তি পাবে না। তোমাদের অভিযাত্রা সুখের হোক ।’- নিত্য শুভার্থী নজরুল ।

তিনি নজরুলের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেন। অপেক্ষার পালায় অত:পর নার্গিস লেখাপড়া করে আই.এ পাশ করেন এবং ‘তহমীনা’ নামে একটি উপন্যাসও লিখেন। ১৯৩৭ সালের ৩০ বছর বয়সে নার্গিসের বিয়ে হয় তাও আলী আকবর খানের পুস্তক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এর সাথে। তার নাম ছিল কবি আজিজুল হাকিম।

তথ্য সূত্র: মো.হাবিবুর রহমান রচিত ‘ছোটদের নজরুল,‘নবারুণ ও বাংলাদেশ সচিত্র প্রত্রিকা,শেখ মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম রচিত-‘নজরুল জীবনের ট্য্রাজেডি’,ডা.আনিস আহমেদের সম্পাদনায়‘কাজী নজরুলের জীবনী’ এবং ওয়েবসাইড থেকে সংগৃহীত ছবি) (৪র্থ পর্ব শেষ- আগামি পর্ব নজরুল-প্রমীলা – চলবে আরও ক’টি পর্ব )

সম্পাদনায় : আবদুল গনি, শিক্ষক,গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক,নজরুল গবেষণা পরিষদ,চাঁদপুর। ০১৭১৮ ২১১-০৪৪, ১৬ ফেব্রæয়ারি ২০২১