Home / রাজনীতি / প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিএনপির দেয়া সেই চিঠিতে যা লেখা রয়েছে
letter-to-hasina

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিএনপির দেয়া সেই চিঠিতে যা লেখা রয়েছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুদেশের মধ্যকার চুক্তির বিষয়ে দেশবাসীকে জানাতে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। দলটির দুই যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও খায়রুল কবির খোকন রোববার এ চিঠি নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাক্ষরিত চিঠিটি গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী প্রাইভেট সেক্রেটারি-২। প্রধানমন্ত্রী শনিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশ গেছেন।

চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাইরে এসে গণমাধ্যমকে মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত একটা চিঠি নিয়ে এসেছিলাম। সেখানে বলা আছে, অতিসম্প্রতি ভারত সফর এবং অন্য দেশের সফরকালীন সময়ে সেই সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তিগুলো হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী সেই চুক্তিগুলো বিষয়ে জনগণের সামনে প্রকাশ করা এবং চুক্তিগুলোর মধ্যে দেশের স্বার্থে হানিকর কিছু হয়েছে কিনা সেগুলো পর্যালোচনার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা দেখেছি ভারত সফর ও সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে শুধুমাত্র জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে কোনো কথা হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রপতির কাছে ফাইল গেছে কি না- সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ জানে না। কিন্তু সংসদে এটা জানানোর এবং পেশ করার সংবিধানের ১৪৫(ক) ধারা অনুযায়ী সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ তাদের অধিকার রয়েছে এ ব্যাপারে জানার। জনগণের সমর্থিত দল হিসেবে বিএনপির এই দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হয়েছে।

মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি। ১৪৫(ক) ধারা অনুসরণ করে অবিলম্বে এটা সংসদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। যাতে এটা পাবলিক ডিসকাশনের ব্যবস্থা হয়। যে পাবলিক অর্থাৎ সাধারণ মানুষই হচ্ছে সংবিধান অনুযায়ী সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক।

বিএনপি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে, বিষয়টি সংসদে উত্থাপন না করে চিঠি দেয়ার কারণ কী-এমন প্রশ্নের জবাবে আলাল বলেন, জাতীয় সংসদে আমাদের সদস্য যারা আছেন তারা কয়েকদফা এ ব্যাপারে নোটিশ দিয়েছেন। তাদের নোটিশ গ্রহণ করা হয়নি। বলার সুযোগও দেয়া হয়নি। তাই আমরা এখানে এসেছি।

এর আগে রোববার বেলা ১১টায় গুলশান চেয়ারপারসনের অফিস থেকে বিএনপির চিঠি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও খায়রুল কবির খোকন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তির নথি প্রকাশ দাবিতে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে। শনিবার রাতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, দুই-এক দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি পৌঁছানো হবে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে শনিবার সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে যেসব চুক্তি করেছেন তা জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি দেব।

ওই চিঠিতে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে যা লেখা হয়েছে তা তুলে ধরা হলো-

‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সৌজন্যে আমরা জানতে পেরেছি যে আপনি সর্বশেষ ভারত সফরকালে ০৫ অক্টোবর ২০১৯ ভারতের সাথে ৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেছেন।

এছাড়া একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় এলপিজি রপ্তানি বিষয়সহ ৩টি প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে মর্মে প্রকাশ। প্রকৃতপক্ষে এ সফরের সময় ভারতের সাথে সর্বমোট কয়টি চুক্তি/সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সে সম্পর্কে জনগণ অবহিত নয়।

ইতিমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে এসকল চুক্তিকে জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী তথা বাংলাদেশবিরোধী চুক্তি হিসেবে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে নির্বিকার। অপরদিকে স্বাক্ষরিত এসকল চুক্তিকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী মর্মে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর পানি সংক্রান্ত চুক্তি ঝুলিয়ে রেখেছে। অথচ ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি উত্তোলনের চুক্তি, বাংলাদেশের উপকূলে ভারতের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে সহযোগিতা বিনিময়ের নামে ভারতকে আমাদের উপকূলে রাডার স্থাপনে চুক্তি এবং মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট চুক্তি সই করার পূর্বে বিষয়টি নিয়ে কখনো কোনো ধরনের পাবলিক ডিবেট অনুষ্ঠিত হয়নি কিংবা বাংলাদেশের জনগণের মতামত গ্রহণ করা হয়নি।

বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল ১৪৫ (ক) তে উল্লেখ আছে যে, বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।

কিন্তু ভারতের সাথে যেসকল চুক্তি সই করা হলো তার কোনোটিই জনসম্মুখে কিংবা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণই এসকল চুক্তির খুঁটিনাটি এবং বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছে। অথচ এসকল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির বিষয়ে অবহিত থাকা জনগণের মৌলিক অধিকার, যে অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত রাখা স্পষ্টতঃই সংবিধানের লঙ্ঘন।

প্রকৃতপক্ষে ভারতসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সম্পাদিত চুক্তিগুলো সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা হয়নি।

এমতাবস্থায় সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুযায়ী ভারতসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত সব চুক্তির পূর্ণবিবরণী অনতিবিলম্বে জাতীয় সংসদ ও জনসম্মুখে প্রকাশ করে জনমনে সৃ্ষ্ট নানাবিধ প্রশ্ন ও সন্দেহ দূর করার আহবান জানাচ্ছি।’