Home / চাঁদপুর / চাঁদপুরে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি: দিশেহারা মানুষ

চাঁদপুরে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি: দিশেহারা মানুষ

চাঁদপুরে শীতের শুরুতে লাগামহীন নিত্যাপণ্যের উর্ধ্বগতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও। ফলে বড় ধরনের জনঅসন্তোষের আশংকাও করছেন কেউ কেউ। বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান দেখা গেলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করছে। আর সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ না করেই বেঁচে থাকতে তা কিনতে বাধ্য হচ্ছে।

সাধারণ মানুষ বলছে, শীতকালে বাজারে নানা শাক-সবজিসহ দেশী তরকারির আমদানি থাকে প্রচুর। অথচ বাজারে সামান্য শাকের দাম সর্বনিম্ন ৫০টাকা। এতে করে ক্রয় ক্ষমতা কমে আসছে মানুষের। এমনকি বাজারে এসব কাঁচা মালের দাম কমবে কিনা তা’ বলতে পারছে না ব্যবসায়ীরা।

রোববার শহরের কাঁচা বাজার ও পাড়া-মহল্লায় ঘুরে দেখা যায়, প্রচুর পরিমাণে শীতের সবজি আমদানি হয়েছে। পালবাজারের কাঁচা বাজারে দেখা গেছে, প্রতিটি সবজির দোকানে শীতের সবজির পসড়া সাজিয়ে রেখেছে ব্যবসায়ীরা। তবে কোন সবজির মূল্যই কম নেই। প্রতিদিনের আমদানিকৃত সবজি দিয়েই চাহিদা মিটে জেলার সিকি কোটি মানুষের।

পালবাজার সবজি ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি কেজি সিম ৭০ টাকা, কুমড়া ৩৫ টাকা, করলা ৫০ টাকা, বেগুন ৫৫ টাকা, ফুলকপি মাঝারি সাইজের ৪০ টাকা, ছোট সাইজের ৩০ টাকা, মুলা ৫০-৬০ টাকা, টমেটো মূল্য ১২০ টাকা, গাজর ৭০ টাকা, শসা ২৫ টাকা, চালকুমড়া প্রতিপিস ৭০-৭৫ টাকা, লাল শাক ৩০-৪০ টাকা, ছোট করলা ৬০ টাকা, লাউ ছোট সাইজের ৪০ টাকা, বড় ধরনের লাউ গড়ে ৫০-৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতিকেজি ২৩০-২৫০ টাকা, ধনেপাতা প্রতি কেজি ১২০-১৫০ টাকা।

সবজি ব্যবসায়ী মিজান ঢালী, সোহাগ মুন্সি ও জামাল বেপারী বলেন, আমরা সবজি কিনে আনি ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে। পরিবহন খরচ শেষে চাঁদপুরে এনে বিক্রি করা পর্যন্ত প্রতি কেজিতে মূল্য বৃদ্ধি হয়ে যায়। সে কারণে খরচসহ আমাদের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজির আমদানি নেই বললেই চলে। আবার অনেকেই বরিশাল অঞ্চল থেকে সবজি আনেন। বর্তমানে লঞ্চের পরিবহন খরচও বেড়েছে। যার কারণে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি ছাড়া উপায় থাকে না।
অপরদিকে শহরের পালবাজার ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, মুদি বাজারে এখন পেঁয়াজের দরই নিয়ে হচ্ছে আলোচনা ও সমালোচনা। বাজারে অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর মূল্য স্বাভাবিক রয়েছে।

পালবাজার মুদি ব্যবসায়ী ছলেমান গাজী বলেন, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্য তেল, লং, এলাচি, দারচিনিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ার কারণে আমাদের ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে। আমাদের দোকান ও গোডাউন ভাড়া, কর্মচারী খরচ দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। পণ্যের মূল্য নিয়ে প্রতিদিনই ক্রেতাদের সাথে দর-দাম করতে হয়।

পালবাজারে আরেক ব্যবসায়ী আক্কাছ মোল্লা বললেন তাদের দুর্দশার কথা। তিনি বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের দেখিয়ে বললেন, দেখেন প্রায় সব ব্যবসায়ী অবসর বসে আছেন। কোন দোকানেই ক্রেতা নেই। ব্যবসায়ী রঞ্জিত পাল বলেন, আমাদের দোকান ও গোডাউনে মিলে ৭ জন কাজ করি। পাইকারি বাজারের মত আমাদেরও এখন খুবই দুরাবস্থা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। আগের মত এখন আর ক্রেতা নেই।

মুদি ব্যবসায়ী মনির মিজি বলেন, প্রতি কেজি রশুন ১৩৫ টাকা, আদা ১৪৫ টাকা, ভোজ্য তেল ৮৫-৯০ টাকা, অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর মূল্য বাড়েনি।

পাল বাজারের চাল ব্যবসায়ী দুলাল খান ও হাফেজ ঢালী বলেন, মোটা চাল পাইকারি প্রতি কেজি ২৮ টাকা, মাঝারি ৩২-৩৫ টাকা, চিকন চাল প্রতিকেজি ৪২-৪৫ টাকা।

পালবাজারের ডিম ব্যবসায়ী লোকমান জানান, প্রতি কেস ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১২৫ টাকা, কক মুরগি ২৪০ টাকা।

সুটকি ব্যবসায়ী সুলাতান ও সুমন বলেন, রূপসা সুটকি প্রতি কেজি ৪শ’ টাকা, গুঁড়া সুটকি প্রতি কেজি ৫শ’ টাকা, লইট্যা সুটকি ৪শ’ টাকা, চিংড়ি শুটকি ৮শ’ টাকা। এছাড়া গরুর গোশত ৬০০-৬৫০টাকা, খাশির গোশত ৯০০-৯৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

শহরের মাছ বাজারগুলোতে পদ্মা-মেঘনা নদীসহ অন্যান্য জলাশয়ে দেশীয় মাছের আমদানি বেড়েছে। গত ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষা অভিযান থাকার কারণে নদী ও সাগরের মাছের আমদানি বন্ধ ছিলো। যার কারণে পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ের মাছের উপর নির্ভর করতে হয়েছে জেলাবাসীকে।

দর যাই হোক বাধ্য হয়ে ক্রয় করছেন ক্রেতারা। তবে ৫ নভেম্বরের পরে শহরের বাজার ও অলিগতি বিক্রি শুরু হয় ইলিশ। এখন বাজারে দেশীয় মাছের আমদানি বেড়েছে। সকালে শহরের পালবাজার গিয়ে দেখা গেছে, প্রচুর পরিমাণে পদ্মা-মেঘনা ও স্থানীয়ভাবে চাষকৃত মাছের আমদানি। তবে পালবাজারে একটি দোকানেও ইলিশের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। যার কারণ হলো এখন বাজারের চাইতে ফেরি করে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ বেশি বিক্রি হয়।

পাল বাজারের মাছ বিক্রেতা মৃণাল দাস, রহমি মুন্সি, আব্দুর রহমান বলেন, তেলাপিয়া মাছ প্রতিকেজি বড় ২৫০ টাকা, মাঝারি ১৮০-২০০ টাকা, ছোট ১৩০-১৫০ টাকা। পাঙ্গাস ছোট (চাষের) ২৪০-২৬০ টাকা, বড় পাঙ্গাস (নদী) ৪৫০ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা। পোয়া মাছ ছোট ৩৫০ টাকা, বড় সাইজের ৬৫০টাকা। রুই মাছ ছোট ৩শ’ টাকা, মাঝারি ৩৫০-৩৮০ টাকা, বড় সাইজের রুই ৪৫০-৪৯০ টাকা। কাতলা বড় সাইজ ৫৫০ টাকা, ছোট সাইজ ১৮০-২৫০ টাকা। গুঁড়া মাছ ২৫০ থেকে ৩শ’ টাকা, গুঁড়া চিংড়ি ২শ’ টাকা, খলিশা ও পুটিসহ মিশ্রিত মাছ প্রতি কেজি ৫শ’ ৫৫০ টাকা।

এদিকে বাজারগুলোতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করতেই সাধারণ মানুষ হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরে ফল ক্রয় করাটা অনেকের জন্য দুঃস্বপ্ন। যে কোন বয়সী মানুষের জন্য প্রতিদিন কম-বেশি ফল খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলে সম্ভব হয়ে উঠছে না। তাই ফলের দোকানগুলোতে ফলের সমারোহ থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম। তারপরে আবার হরেক রকম ফলের মূল্য দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শহরের কালিবাড়ী ও পালবাজার ফল দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই ফলের আমদানি রয়েছে আগের মতই। তবে শীতের কারণে কমলার আমদানি কিছুটা বেড়েছে। পাল বাজারের ফল ব্যবসায়ী স্বপন ও চন্দন বলেন, প্রতি কেজি আপেল ১৫০ টাকা, ছোট আপেল ১৮০ টাকা, পেয়ারা বড় সাইজের ৮০ টাকা, দেশীয় পেয়ারা ১২০ টাকা, তেঁতুল ১১০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, মুসাম্বি ১৪০-১৫০ টাকা, কমলা প্রতি কেজি ১৮০-২০০ টাকা, পাঁকা পেঁপে ১৩০ থেকে ২শ’ টাকা, আনারস প্রতি পিস ছোট ৬০ টাকা, মাঝারি ৮০-৮৫ টাকা, বড় সাইজের ১৫০ টাকা, লাল আঙ্গুর ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা, সাদা আঙ্গুর ২৪০ থেকে ২৭০ টাকা।

একই বাজারের ফল ব্যবসায়ী মিজান বেপারী ও রুস্তম খান বলেন, ফলের ক্রেতা না থাকার কারণে আমাদের দোকানে থাকা অধিকাংশ ফলই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বেশি নষ্ট হয় আঙ্গুর, পেঁপে, মুসাম্বি ও আপেল। প্রতিদিনই আমাদের লাভ না হলেও লোকসান গুণতে হচ্ছে। ক্রেতা কম থাকার কারণে আমরা ফলের আমদানিও কম করছি। যার কারণে বাজারে মূল্য বেশি।

করেসপন্ডেট,১০ নভেম্বর ২০২০