Home / কৃষি ও গবাদি / বেড়েছে চাহিদা : গম আমাদানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ পঞ্চম
gome

বেড়েছে চাহিদা : গম আমাদানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ পঞ্চম

দেশের মানুষের ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমছে, আটা থেকে তৈরি খাদ্যের ভোগ বাড়ছে, ভাতের চেয়ে আটায় প্রোটিন বেশি, জলীয় অংশ কম, বিশ্বে গমের আমদানি বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ ২ য়, গত পাঁচ বছরে আমদানি বেড়েছে ৩৬%, গত পাঁচ বছরে দেশে উৎপাদন বেড়েছে ২০%

দোকানের নাম বাগেরহাট মিষ্টান্ন ভান্ডার। নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার পাশে ওছখালির এই দোকানে সারা দিন ভোক্তাদের ভিড়। দোকানে নানা পদের মিষ্টি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ ভোক্তার টেবিলে রুটি-পরোটা ও ভাজি। দোকানটির পাশে আরও আটটি খাবারের দোকান রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, চার-বছর আগেও দোকানগুলোতে ভাত ও মাছ ছাড়া আর কিছু বিক্রি হতো না। তা–ও দুই বেলা ক্রেতাদের সমাগম হতো। এখন সারা দিন সেখানে আটার তৈরি পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা, মোগলাই পরোটা বিক্রি হয় বেশি।

এই চিত্র শুধু হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপ নয়; সম্প্রতি কক্সবাজারের সদর উপজেলা, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া ও মহেশখালীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন দোকানে আটার তৈরি নানা খাদ্যসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তাঁদের দোকানগুলোতে ভাতের চেয়ে আটার তৈরি খাদ্যসামগ্রী বেশি বিক্রি হচ্ছে। শুধুই কি হোটেল, এসব এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, বাসায়ও খাবারের তালিকায় আটার তৈরি খাবার দিনকে দিন বাড়ছে।

দেশের উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন অবশ্য সারা দেশেই কমবেশি ঘটে গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) থেকে চলতি সপ্তাহে বিশ্বের খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও আমদানির চিত্র নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির হিসাব বলছে, বিশ্বের যে কটি দেশে সবচেয়ে দ্রুত হারে গমের আমদানি বাড়ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। পাঁচ বছর আগেও গম আমদানিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১০ দেশের তালিকার বাইরে ছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ এই তালিকায় পঞ্চম দেশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক নাজমা শাহিন প্রথম আলোকে বলেন, দেশের মানুষের ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমছে এবং আটা থেকে তৈরি খাদ্যের ভোগ বাড়ছে। ভাতের চেয়ে আটায় প্রোটিন বেশি ও জলীয় অংশ কম থাকে। ফলে এটি বেশি খাদ্যশক্তির জোগান দেয়। ভাতে স্টার্চ বেশি থাকে। ফলে ভাত খেয়ে পরিশ্রম কম করলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়া রুটির দামও ভাতের চেয়ে তুলনামূলক কম।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গমের আমদানি বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। আর উৎপাদন বেড়েছে ২০ শতাংশ। গত অর্থবছর বাংলাদেশ গম আমদানি করেছে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছর তা বেড়ে ৬০ লাখ টনে উত্তীর্ণ হতে পারে বলে সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে। গম আমদানিতে শীর্ষস্থানীয় চারটি দেশ হলো মিসর, ইন্দোনেশিয়া, আলজেরিয়া ও ব্রাজিল। এই দেশগুলোতে সব মিলিয়ে গত অর্থবছর মোট পাঁচ কোটি সাত লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। প্রধান গম রপ্তানিকারক দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউক্রেন।

গম উৎপাদনেও বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে গমের উৎপাদন ৯ লাখ টন থেকে বেড়ে প্রায় ১২ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া গমের সঙ্গে সাধারণত ভুট্টা মেশানো হয়। ভুট্টার উৎপাদনও বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৩০ হাজার টন। আর গত বছর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৯ লাখ টন। ভুট্টার বেশির ভাগই গমের সঙ্গে মিশিয়ে পোলট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ছে। অসংক্রামক রোগ নিয়ে সরকারের ২০০৬ সালের জরিপে (স্টেপস ২০০৬) বলা হয়েছিল, প্রাপ্তবয়স্কদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সরকার সম্প্রতি এ বিষয়ে আরও একটি জরিপ (স্টেপস ২০১৮) শেষ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৭৬ লাখের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।

রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ভাতের চেয়ে রুটি খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। এ ছাড়া অনেকে স্বাস্থ্য সচেতনতার জায়গা থেকে এক বেলা ভাত ও দুই বেলা রুটি খাচ্ছেন। এসব কারণেও দেশে রুটি, পাউরুটি ও আটা থেকে তৈরি খাদ্যের ভোগ বাড়ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খাদ্য নীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইফপ্রি, বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আখতার আহমেদ বলেন, ‘কোনো দেশে নগরায়ণ ও মাথাপিছু আয় যত বাড়বে, ভাতের চেয়ে অন্যান্য খাবার যেমন রুটি, মাছ, মাংস ও দুধ খাওয়ার পরিমাণও বাড়বে। নগরায়ণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশের ঘরের বাইরে খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশে আমরা সেই পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। এটা পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ইতিবাচক দিক। তবে এসব খাবারের যাতে যথাযথ মান নিশ্চিত করা যায়, বিশেষ করে হোটেল ও বিভিন্ন কোম্পানির আটার তৈরি খাবারের মান যাতে নিশ্চিত করা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।