Home / উপজেলা সংবাদ / মতলব উত্তর / ‘কি ভাইরাস আইলো পেটে তো ভাত নাই, তাই রিক্সা নিয়ে বের হয়েছি’

‘কি ভাইরাস আইলো পেটে তো ভাত নাই, তাই রিক্সা নিয়ে বের হয়েছি’

বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের থাবায় আতঙ্কিত মানুষ। দেশে প্রতিদিন বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া প্রায় সবকিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনসাধারণকে বাসা-বাড়িতে থাকতে বলা হচ্ছে। এতেই বিপাকে পড়েছে হাজার হাজারখেটে খাওয়া ছিন্নমূল মানুষ ও রিক্সা চালক,ভ্যান চালকরা। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে অনেকে কর্মহীন। উপার্জন নেই। অনেকের ঘরে আহার নেই।

৩১ মার্চ মঙ্গলবার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর বাজার থানা রোড সংলগ্ন রোডে ২১ বছর ধরে রিক্সা চালানো মোস্তফা (৫০) নামে এক সহজ সরল রিক্সা চালকের সঙ্গে কথা বলে তার মানবেতর জীবন যাবন ও নানান কষ্টের কথা জানা যায়।

মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌর এলাকার সকলের কাছে অতি সহজ সরল হিসেবে পরিচিত এসএসসি পাস মোস্তফা (৫০) নামে একজন রিক্সা চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোস্তফার ১ এক ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়েই তার সংসার। তার গ্রামের বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের বালুচর গ্রামে তার বসবাস। সে এসএসসি পাস করার পর সাংসারিক অভাব অনটনের কারনে তাকে পেটের দায়ে রিক্সা নিয়ে নামতে হয়। সে থেকে তার আর পড়া হয়নি।

দীর্ঘ ২১ বছর যাবত সে রিক্সা চালিয়ে দিন যাপন করছে। তার স্ত্রী তার দু’টি সন্তানদেরকে ছোট রেখেই তাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। সে থেকে তিনিই একমাত্র এ দু’সন্তানের তিনি বাবা,তিনিই মা। তার বড় সন্তান আল-আমিন বর্তমানে উপজেলার ছেংগারচর মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণীতে পড়ছে। আর দ্বিতীয় সন্তান আমেনা আক্তার একই স্কুলে ৮ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করছে। কাক ঢাকা ভোর হতে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত রিক্সা চালিয়ে যা উপার্জন করে তা দিয়েই তার সন্তানের পড়াশুনার খরচ আর তার সংসার খরচ। সন্ধ্যার পর যখন ছেংগারচর বাজারে কোনো যানবাহন থাকে না, তখন এই সহজ সরল রিক্সা চালক মোস্তাই একমাত্র অবলম্বন বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও জনসাধারণের।

আধুিনকতার ছোঁয়ায় উপজেলার প্রায় সকল রিক্সার এখন অটো বাইকে রুপ নেওয়ায় একমাত্র মোস্তফার রিক্সাটি পায়ে চালাবার একমাত্র রিক্সা। অর্থ্যাৎ মোস্তফা তার দীর্ঘ ২১ বছরের পা দিয়ে চালাবার রিক্সা কস্ট হলেও তিনি তা ধরে রেখেছেন। অনেক অটোবাইক বা অন্যান্য যানবাহনে বেশি ভাড়া চাওয়া বা নেওয়ার ঘটনা থাকলেও রিক্সা চালক মোস্তফার কোনো চাহিদা থাকেনা। তার ভাড়া একটু কমমূল্যে যাত্রীরা যেতে পারে। এ জন্য মোস্তফা সকলের কাছে জনপ্রিয়। এতো দিন তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিক্সা চালিয়ে ৫০০-৬০০ টাকা রোহজগার করতে পারতেন। দৈনিক তার যা রোজগার হতো তা দিয়ে মুটামুটিভাবে চলে যেতো তার জীবন যাবন। কিন্তÍ বর্তমান সময়ে করোনা ভাইরাসের কারণে আগে যেখানে দৈনিক ৫শ থেকে ৬শ টাকার রোজগার হতো। সেখানে তার এখন সারা দিন রিক্সা চালিয়ে ৭০-৮০ টাকা রোজগার হয়। তা দিয়ে চলে না তার সংসার। মানবেতর জীবন যাপন করছে সে।

রিক্সা চালক মোস্তফা বলেন, কি ভাইরাস যে আইলো,সরকার যানবাহন চলাচালে নিষেধ করেছে। মানুষজনকেও জরুরুী প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হচ্ছেনা। আগে দৈনিক ৫শ থেকে ৬শ টাকার রোজগার হতো। এখন সারা দিন রিক্সা চালিয়ে ৭০-৮০ টাকা রোজগার হয়। আমগো অভাব না থাকলে আমরাও গাড়ি নিয়ে বের হইতাম না কিন্ত কি করমু পেটে তো ভাত নাই, তাই রিক্সা নিয়ে বের হয়েছি। কি ভাইরাস আইলো। আমাগো শান্তি হারাম কইরা দিলো এই ভাইরাস। খাইতে পারি না, ঘুমাইতে পারি না। মানুষতো ভয়ে বাড়ি থেকে বাহির হয় না। আমরা কই যামু কন আমাদেরতো কিছুই নাই।

মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত মাত্র ৪০ টাকা রোজগার করেছি। এই ৪০ টাকার মধ্যে ২০ টাকা খরচ হইয়া গেছে। এখন ছেলে-মেয়েগুলোকে কি খাওয়াবো। আগে সারাদিন রিক্সা চালিয়ে যা পাইতাম, তাই দিয়ে ডাল ভাত খাইতাম। এখন রোজগার নাই। আর পাচ্ছিনা। বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে আছি। কে আমগো এখন খাওন দিবু। কারও কাছ থেকে কিছু চেয়ে খাবো, সেই অবস্থাও নাই। কার কাছে চাইব, সবকিছুইতো বন্ধ, লোকজনতো নাই। মানুষতো ভয়ে বাড়ি থেকে বাইর হয় না। রিক্সা নিয়ে কোনো জায়গায় বসে থাকতেও পারি না, পুলিশে ধাওয়া করে। মরি আর বাঁচি এখন এই রাস্তাতেই থাকতে হইবো। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি খাদ্যসামগ্রী পাননি।

এদিকে সহজ সরল রিক্সাচালক মোস্তফা সরকারের কাছে আবেদন যদি তার জন্য কোনো থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সাহায্য সহযোগিতা করতো তাহলে সে তার ছেলে -মেয়ে নিয়ে তার এই কষ্ট থেকে বেঁচে যায়।

প্রতিবেদক:কামাল হোসেন খান,১ এপ্রিল ২০২০