Home / রাজনীতি / নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ২ প্রস্তাব বিএনপির

নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ২ প্রস্তাব বিএনপির

সংবিধানসম্মত ও সংবিধানবহির্ভূত—দুই ধরনের নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে বিএনপি। সংবিধানের বাইরে যেতে হলে নতুন আইন পাস করে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

দলটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, সংবিধানের মধ্যে থেকে দিতে যাওয়া সম্ভাব্য প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখেই সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথা বলা হবে, যাতে নির্বাচনের সময় সব দলের প্রার্থীর সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তৈরি হয়।

এ ক্ষেত্রে ‘রুলস অব বিজনেস’ পরিবর্তন করে নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর কথা উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের দলীয় সভাপতির পদ ছাড়ার কথাও বলা হবে।

আর সংবিধানের বাইরে দিতে যাওয়া প্রস্তাবে থাকছে প্রথমত, রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে, দ্বিতীয়ত, স্পিকারের নেতৃত্বে এবং তৃতীয়ত, নাগরিকসমাজের গ্রহণযোগ্য একজনের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার। সব ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি বড় দলগুলোকে নিয়ে ওই সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব থাকবে।

সহায়ক সরকারের প্রস্তাব তৈরির কাজে সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত রূপ নেয়নি। এ নিয়ে অত্যন্ত গোপনে কাজ করছেন বিএনপির ‘থিংকট্যাংক’ সংশ্লিষ্ট সুধীসমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি ও সিনিয়র নেতা।

তাঁরা জানিয়েছেন, প্রস্তাবনার খসড়া তৈরি শেষ হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনার পর তা চূড়ান্ত হবে। আগামী ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে অবস্থানরত দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হবে। লন্ডন থেকে তিনি ফেরার পর আগস্টের মাঝামাঝি জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে সহায়ক সরকারের প্রস্তাব।

সংবিধানের ১২৩-এর (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ রেখে এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে দুইভাবেই নির্বাচনের সুযোগ আছে। এই অনুচ্ছেদের (ক) অংশ অনুযায়ী ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে’ নির্বাচনের কথা উল্লেখ আছে। আর (খ)-তে বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। ’

অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি থাকলে রাষ্ট্রপতির পরামর্শে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেও সংসদ ভেঙে দেওয়া যাবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপির সহায়ক সরকারের প্রস্তাব নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। এটি চূড়ান্ত হতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে এটুকু বলা যায়, অযৌক্তিক কোনো প্রস্তাবনা এতে থাকবে না, যা থাকবে তাতে দেশের জনগণ বুঝবে যে বিএনপি শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই চায়। অন্য কোনো এজেন্ডা বিএনপির নেই। ’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রস্তাবে কী থাকবে সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। তবে সহায়ক সরকার বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা। এটি কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর বিষয় নয়। কারণ সহায়ক সরকার ছাড়া এ দেশে আর ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব নয়—সেটি দেশের জনগণ জানে। আর এ জন্যই বিএনপির এ ধরনের একটি প্রস্তাবের জন্য তারা অপেক্ষা করছে। ’

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, সংবিধানের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের প্রস্তাব নিয়ে বিএনপি চিন্তা করলেও শেষ পর্যন্ত হয়তো শেখ হাসিনার আগের দেওয়া প্রস্তাবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপিপন্থী সুধীসমাজের আরেকজন প্রতিনিধি বলেন, সংবিধানের ভেতরে ও বাইরে দুই ধরনের প্রস্তাবই থাকবে। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে সরকার চাইলেই কেবল তা বাস্তবায়ন সম্ভব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রুলস অব বিজনেস পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘রুলস অব বিজনেস পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো যায়। কিন্তু এর জন্য আইন পাস করাতে হবে। কারণ রুলস অব বিজনেস একটি আইনের অধীনে করা হয়েছে। ’

মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাঁচজন করে সদস্যের সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাতে স্বরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বিএনপি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি নির্বাচনও বর্জন করে।

সংবিধানের মধ্যে প্রস্তাব

বর্তমানে জনসমর্থনের যে অবস্থা তাতে নির্বাহী ক্ষমতা খর্ব করে এবং দলীয় সভাপতির পদ ছাড়লে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখেও নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে বিএনপির বড় একটি অংশ। তাঁদের মতে, শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতির পদ ছাড়লে প্রশাসনে তাঁর প্রভাব কমে যাবে। পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। আর সেই পরিস্থিতিতে বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার উঠবে বলে ধারণা দলটির নেতাদের।

তা ছাড়া সমঝোতা হলে সংবিধান বহাল রেখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগও করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সংসদ উপনেতাই তখন সংসদ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন—এমন একটি প্রস্তাব দিতে চায় দলটি। পাশাপাশি সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে এমপিদের তখন আর নির্বাচনী এলাকাগুলোতে প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না। ফলে বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হবে বলে মনে করে দলটি।

তবে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি সংসদে না থাকায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক জটিলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রস্তাব হলো নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের মন্ত্রিসভা কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ সদস্যের করা। যাতে বিএনপির চার-পাঁচজনকে টেকনোক্র্যাট কোটায় নেওয়া যায়।

সূত্রমতে, দলটির প্রস্তাব হলো প্রতিরক্ষা, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো বিরোধীদের দিতে হবে। পাশাপাশি সাংবিধানিক কারণে ৫০ জনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হলেও দুই দলের ১৯ জন ছাড়া বাকি সদস্যদের নিষ্ক্রিয় রাখার প্রস্তাবনা থাকবে।

এর বাইরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রস্তাব থাকবে; যাতে দলটি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে এবং পুলিশ যাতে তাদের হয়রানি করার সুযোগ না পায়। পাশাপাশি সব জেলার বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) বদলির প্রস্তাবনা থাকবে। থাকবে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবিও।

সংবিধান সংশোধন করে সহায়ক সরকার

রাষ্ট্রপতি কিংবা স্পিকারের নেতৃত্বে সহায়ক সরকার গঠন করতে চাইলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। যদিও তাঁরা সরকারেরই অংশ এবং প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন বলে বিএনপি মনে করে। তার পরও দলটি কৌশলগত কারণে এ দুজনকে প্রধান করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিতে চায়। উদ্দেশ্য হলো অন্তত ওই সময়ের জন্য জনগণের সামনে স্পষ্ট করা যে সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা এখন আর নেই। দলটি এও মনে করে যে প্রশাসনে শেখ হাসিনার প্রভাব আর ওই দুজনের প্রভাব কখনোই এক হবে না।

তা ছাড়া ওই দুজনকে প্রধান করে দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ‘অন্য কারো ওপরই সরকারের আস্থা নেই’; এটিও জনগণের সামনে স্পষ্ট হবে বলে মনে করে দলটি।

বড় দল থেকে মন্ত্রিসভায় সদস্য নিয়োগের মাধ্যমে নাগরিক সমাজের মধ্যে গ্রহণযোগ্য একজনকে প্রধান করে সহায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রভাবশালী দু-একটি দেশের কূটনীতিকদের পরামর্শে দেওয়া হতে পারে।

সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য ওই প্রস্তাব তৈরির ব্যাপারে বিএনপি ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের কাছ থেকেও সময় সময় পরামর্শ নিচ্ছে। আলোচনায় কূটনীতিকরা বিএনপি নেতাদের বলছেন, সরকারের মেনে নিতে সুবিধা হয় এমন বাস্তবসম্মত প্রস্তাবই যাতে তাঁরা দেন।(কালের কণ্ঠ)

নিউজ ডেস্ক
আপডেট,বাংলাদেশ সময় ১০ : ৪০ এএম, ১ জুলাই ২০১৭,শনিবার
এইউ

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কারাগারে আটক নেতাদের সাথে মতলব বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের সাক্ষাৎ

মতলব ...