Home / আরো / ফিচার / লালচে সুন্দরীর ছোবলে নীল হচ্ছে সোনার বাংলা
লেখক- খন্দকার মোহাম্মদ ইসমাইল

লালচে সুন্দরীর ছোবলে নীল হচ্ছে সোনার বাংলা

মানুষকে মৃত্যু ও জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়া যায়, যে বাহন তার নাম মাদক। বর্তমানে মাদকের মধ্যে লালচে সুন্দরী যার নাম ইয়াবা রাণী (মেইড ইন বার্মা)।

এ রাণী অতি অল্প সময়ের মধ্যে তার খারাপ রূপের বাহারে দিন মজুর থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত মাদকসেবীদের লাইলী হতে সক্ষম হয়েছে।

এ লালচে সুন্দরীর ছোবলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ নীল বর্ণ ধারণ করতে যাচ্ছে। যদি আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করি, তাহলে বসে আছি কেন? দেশকে বিষমুক্ত করতে আমি কি এখনও ওজা হয়েছি?

তাহলে মঞ্চে সেমিনারে কেন এই মহামানবের কথা বলে আমি তার সৃষ্টি বাংলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছি। যেখানে আমি নিজেকে ঘৃণা করার কথা। কিন্তু বিপরীতে আমি সেই দলীয় পদ-পদবীর পরিচয় দিয়ে বুক ফুলিয়ে সমাজের নিয়ন্ত্রক।

চিন্তা করুন না! আমি যেখানে পা রাখবো সে স্থানেই যদি মাটি না থাকে তাহলে শত কোটি টাকা আর আত্মসম্মান নিয়ে আমি তলিয়ে যাবো। শেষ পর্যন্ত লাভ কি?

আসুন নিজে নিজে শপথ করি। এই বাংলা আমার। এই মাটি অতি খাটি। আমি সোনার সাথে তুলনা করবো না কারণ সোনার মধ্যে ধাতব থাকে। যদি আমি এটা চিন্তা করি যে ১৬ কোটি মানুষ সুখী হলে আমি সুখী। যে আদর্শ আমি ধারণ করব। ঠিক মঞ্চেও সে বক্তৃতা দিবো।

অনুরোধ করবো মঞ্চে দেয়া বক্তৃতার বিপরীত কাজটি যেনো না করা হয়।

আমার দেখা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি যিনি একই সাথে আইনজীবীও বটে। তিনি সব সময় দেখতাম মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্ছার। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে, দু’জন বড় মাপের মাদক ব্যবসায়ীর আইনজীবী তিনিই নিযুক্ত হন।

আসুন নিজ স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করি নিজের জন্য এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সোনার বাংলা উপহার গড়তে মনে প্রাণে চেষ্টা করি। তাহলে অন্তত বলতেতো পারবো যে দেখো মজিব তোমার মত হতে পারিনি কিন্তু তোমার সাথেতো সম্পৃক্ত হয়েছি।

আমার এ লেখাটা প্রকাশিত হওয়ার পর যারা দলীয় পরিচয়ে মাদকের সাথে জড়িত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাদেরকে না বলুন। একই সাথে আজকে থেকে বন্ধ না করলে সে দলের কেউ নয় জানিয়ে দিন। দেখবেন বাংলাদেশের মাদকের পরিমাণ একদিনেই অর্ধেকে নেমে আসবে।

স্বজনপ্রীতি যে মারাত্মক সুনামি (দুর্যোগ) এটা কি আমরা এখনো উপলব্ধি করি? হয়তো আমি নিজেও করি না। তবে চেষ্টা করি। এ স্বজনপ্রীতির কারণে আমরা সামান্য সীমান্ত পথ যা দিয়ে বিশেষ করে ইয়াবা আসে। তা’ও বন্ধ করতে পারছি না।

আমি মনে করি এটা বন্ধ করার জন্য পুলিশ, বিজিবি কারো প্রয়োজন নেই। যদি সরকার স্থানীয় সংসদ সদস্য মহোদয়কে দায়িত্ব প্রদান করে তাহলেই যথেষ্ট।

তখন দেখবেন, আনিত ইয়বার মজুদ শেষ হলে সেবীরা দিকহারা হয়ে গুগলে সার্চ করতে থাকবে কোথায় ইয়াবা পাওয়া যায়!

আজকের এ লেখায় আমি মাদক সেবনের ক্ষতির দিকগুলো বলবো না। আমরা যে যেখানে অবস্থান করছি, সেখানেই বুঝার ক্ষমাতাটা হারিয়ে এসেছি। না হলে ব্যানসন সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ভয়ংকর ছবি থাকার পরেও ২১০/- টাকা দিয়ে ক্রয় করতাম না। তাই বলবো, শুধুমাত্র কঠোর আইন প্রয়োগ করে নয়, প্লে কার্ড, ফেস্টুন, ডিজিটাল ব্যানার দিয়ে প্রচার নয়, মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন নয়, পুলিশ ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃক গ্রেফতার নয়।

দায়িত্ব এখন সরকারের। সেখান থেকেই শুরু করতে হবে।
আমার চলার পথের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, গ্রেফতারে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যায়, যেমন একজন ডিলারের নিয়োজিত ৩ জন সহকারী থাকে। যদি ওই ডিলার গ্রেফতার হয়, তাহলে সহকারীরা মাদক ব্যবসা বন্ধ করে কি বৈধ কর্ম করবে? না করবে না। কারণ, তারা বিনাশ্রমে অধিক টাকা পাওয়ার সকল পথ জানে। এসব সহকারীরাই ডিলারের স্থানটি দখল করে।

এরপরে এরাও আবার ডিলার হয়ে প্রতিজন এক থেকে দু’জন সহকারী নিয়োগ করবে। কিছু দিন পর গ্রেফতার হওয়া ডিলার জেল থেকে জামিন পেয়ে তিনি কি বসে থাকবেন?

না, তিনি বসে থাকবেন না। আগে যদি সে স্থানীয় ডিলার থেকে মাদক ক্রয় করতো, জেলে যাওয়ার পর হাজতে থাকা টেকনাফের মাদক ব্যবসায়ীর সাথে পরিচিত হওয়ায় এখন সে টেকনাফ থেকে আনবে। গ্রেফতার হওয়া ডিলার তার গ্রেফতারকে ভাগ্যদেবী বলে মনে করে। একই সাথে আট জনের ভাগ্যের দুয়ার খুলে গেল।

আটজনের সমিকরণে বলা যায়, পূর্বের তিন সহকারী, তাদের নিয়োগকৃত তিন জন, গ্রেফতার হওয়া ডিলার জেল থেকে এসে নিয়োগ দেয় আরো দু’জন (৩ + ৩ + ২ =৮)।

ভয়কে জয় করবো-
সত্য কাকে কখন বিদ্ধ করে, রোষাণলে পড়ার ভয়ে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশ করতে চাই না। ভয় আমাদের দেশের মানুষকে গ্রাস করে ফেলছে।

কথা ছিল মানুষ ভয়কে জয় করবে, কিন্তু ভয় মানুষকে জয় করে ফেলছে। কিন্তু ভয়ের কারণে সত্য প্রকাশ না করায় আজকে সকল ক্ষেত্রে চুড়ান্ত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছতে পারছি না।

যেমন মা সন্তানের অপরাধ সব সময় বাবার নিকট গোপন রাখে। গোপন রাখার ফলে এক সময় সে বড় অপরাধে জড়িয়ে নিজেও সর্বনাশের জায়গায় চলে যায় একই সাথে পরিবারকেও নিয়ে যায়।

বুঝার সক্ষমতার অভাব
বর্তমানে শিক্ষার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ফেসবুক। যে মাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ, দেয়া, নিজের মতামত প্রকাশ করাসহ অনেকভাবে এটাকে সু-শিক্ষা গ্রহণের কাজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু দেখা গেল, এতো সুন্দর একটি শিক্ষার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে আমরা কু-চিন্তার মাধ্যমে বিকল্পভাবে ব্যবহার করে এটাকে এমন নোংরামির দিকে নিয়ে গেছি যার ফলে এটা একপর্যায়ে বন্ধ করার উপক্রম।

এক্ষেত্রে একটি ঘটনায় দেখা গেলো যে, সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত মেয়েকে বিয়ে না করালে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। তাহলে ত্রুটি কোথায়? ব্যক্তির না শিক্ষার। কেউ কি আদৌ চিন্তা করছেন?

সমাজে কোনো অপরাধ বিরাজমান থাকলে ভাববেন না, আপনার ঘরে প্রবশে করতে পারবে না। এ জন্য প্রবেশ করার পূর্বে দরজাটা কাঠ মেস্ত্রী ঠিকমত করছে কি না, তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখুন না! এটা বলার মানে হলো শুধু সরকার বা অন্যান্য সংস্থা করবে তাদের ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেকটি কাজই আমার মনে করে শুরু করি।

মাদক কিভাবে বিস্তার লাভ করে-
মাদক বিস্তারে কখনো কখনো আমরা প্রথমে পুলিশ ও রাজনীতিবীদদের দোষারোপ করি। কিন্তু আপনি কি ভাবছেন বিস্তারে আপনার দায় ও আছে?

যেমন পুলিশ একজন মাদক ব্যবসায়ীকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর পুলিশ কি তাকে ছাড়ার টেন্ডার আহ্বান করে? করে না।

বরং আমি বলবো, সমাজে আপনি ক্ষমতাবান, আটককৃত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজন আপনাকে অনুরোধ করলে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন ও তার আত্মীয় স্বজনের সু-দৃষ্টিতে থাকার উদ্দেশ্যে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুলিশ থেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য তদবির শুরু করেন। পুলিশ রাজি না হলে টাকার অংক বাড়িয়ে প্রলুব্ধ করে ছাড়িয়ে অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে আনেন।

এখন বলছি, পুলিশ তো মানুষের বাহির নয়! টাকা এবং নারী এ দু’বিষয়ের প্রতি দূরে থাকা কতো কঠিন নিজেকে দিয়ে চিন্তা করুন।

অথচ, আপনার দায়িত্ব ছিল পুলিশ কোনো অনৈতিক কাজ করলে বাধা দেয়া। সেটা না করে আপনি পুলিশকে অপরাধের মধ্যে নিয়ে গেলেন। এদিকে ছাড়িয়ে নেওয়া ব্যক্তিটি পুলিশকে দেয়া টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যবসার পরিধি বড় করবে, একই সাথে তার আর্থিক উন্নতি ঘটবে। এক সময় সে তিন লাখ টাকা দামের এফজেড হোন্ডা দাবড়িয়ে বেড়াবে। আর তা দেখে আপনার যুবক ছেলেটার চোখ ছানাবড়া করবে। এই আকর্ষণে দেখবেন একসময় আপনার কলিজার টুকরা ছেলেটাও ছাড়িয়ে আনা মাদক ব্যবসায়ীর সাথে মিশে এ ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে।

অসম বন্ধুত্ব হলে, যেমন একজন প্রভাবশালীর সন্তানের মধ্যবত্তি বন্ধুকে মাদকের আড্ডায় নিয়া এবাধিকবার অনুরোধ করার পর সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাদক সেবন করতে বাধ্য হয়ে একসময় সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

এছাড়া রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, অভিভাবক কর্তৃক হিসাব বহির্ভূত অর্থ দেওয়া। পাশাপাশি মাদক বিক্রেতা/সেবনকারী থাকলে সামাজিকভাবে আইন শৃংখলা বাহিনীর সাহায্য বন্ধ করাও মাদকসেবী বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কিছু কারণ।

সন্তানের দিকে নজর রাখুন-
পরিবারের নজরাধীন না থাকায় ছেলে মেয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বাহিরে কোথায় কি করে
তা পর্যবেক্ষণ করে শাসনের মধ্যে না রাখা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ছেলে মেয়ে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার চলাফেরা ও আচরণেই অনেকটা বুঝা, সেটা কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আপনাকে বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে বিপদগামী বন্ধুর সাথে চলাফেরা থেকে সন্তানকে বিরত রাখতে হবে।

মাদক প্রতিরোধে উপায়-
স্বজনপ্রীতি ঊর্ধ্বে উঠে দলমত নির্বিশেষে সমাজের নেতৃস্থানীয় সকলের সমন্বয়ে আইন শৃংখলা বাহিনীর মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। তালিকা অনুযায়ী মাদক ব্যবসায়ী, তার অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বাড়ির কর্তাব্যক্তিসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতার উপস্থিতিতে স্থানীয় সাংসদ মহোদয়ের মাধ্যমে থানা/ইউনিয়ন ভিত্তিক সভা করে মাদক ব্যবসা বন্ধ করার জন্য যার যার অবস্থান থেকে কঠোর ভাবে না বলতে হবে।

এ ব্যবস্থার পর যারা মাদক বিক্রি বন্ধ করবে না তাদের নাম, ঠিকানা, ছবিসহ পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। একই সাথে তাদেরকে ঘৃণাসহ সামাজিক ভাবে বয়কট করতে হবে। পরবর্তীতে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের পর কোনো নেতা তদবীর করলে তাকে সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার অথবা স্থানীয় সাংসদ মহোদয়কে অবহিত করা। একই সাথে থানায় জিডিতে নোট করত: জেলা বিশেষ শাখায় প্রতিবেদন দাখিল করা।

ফলে ভভিষ্যতে ওই তদবীরকারী নেতা পদ পদবী পেতে তদবীরের বিষয়টি প্রতিবন্ধকতা হিসাবে কাজ করে।
এরপরেও গুটি কয়েক মাদক ব্যবসায়ী থাকলে তাদেরকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারে সহয়তা করা।

একটি সমিকরণ-
একটি সমিকরণ দিয়ে আজকের লেখার ইতি টানবো। বর্তমানে ইয়াবার বিপরীতে আমাদের যে পরিমাণ টাকা বার্মা (মিয়ানমার) পাচার হচ্ছে তা’ আমাদের এক বছরের বাজেটের অর্ধেক। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে আমি সমীকরণ দিতে পারবো।

রক্ষা করুন না দেশটাকে! রক্ষা করুন আপনার সন্তানকে! আমি আজকে সেবন করছি আগামি কাল আপনার সন্তান সেবন করে টাকার জন্য আপনাকে মারধর কারবে না এই নিশ্চয়তা কি দিতে পারবেন?

লেখক-খন্দকার মো: ইসমাইল
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা,
চাঁদপুর।

নিউজ ডেস্ক
: আপডেট, বাংলাদেশ সম ২: ০০ এএম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬, বুধবার
ডিএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শ্রেণিকক্ষ সংকটে ব্যাহত দিঘলদী সপ্রাবির শিক্ষা কার্যক্রম

শ্রেণিকক্ষ ...