Home / সাক্ষাৎকার / ‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট

‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট

‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট” বাক্যটি সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ থেকে নেয়া। পাঠক হিসেবে বিভ্রান্ত না হতে পুরো সাক্ষাতকারটি পড়তে হবে। তার এ সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সহকারী সম্পাদক রাজু আলাউদ্দিন।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও দেশের সর্ববৃহৎ শোলাকিয়ার ঈদ জামায়াতের ইমাম।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক এই আলেম লেখক ও অনুবাদক হিসেবেও পরিচিত।

আলোচনা-সমালোচনায় উঠে আসেন প্রায়ই। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে তাঁর যোগদান অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘জামায়াত একটি ভণ্ড দল, ইসলামের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় কার্যকর না হলে আওয়ামী লীগকে জনগণ ভোট দেবে না বলেও এক সময় মন্তব্য করেছেন মাওলানা ফরীদ উদ্দীন।

গত জুনের মাঝামাঝিতে ইসলামের নামে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ ‘হারাম’ বলে ফতোয়া দিয়েছেন লক্ষাধিক মুফতি ও আলেম-ওলামা। জঙ্গিদের জানাজা পড়াও হারাম বলে মত দেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা বলছেন, যাঁরা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মারা যাবেন তাঁরা শহীদের মর্যাদা পাবেন। সেই আলেমদেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

রাজু আলাউদ্দিন: আসসালামু আলা্ইকুম।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

রাজু আলাউদ্দিন: কেমন আছেন?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: পরিবেশ-পরিস্থিতি হিসেবে অনেক সময় মানসিকভাবে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করছি। যে ধরনের সমাজ হওয়া উচিৎ ছিল… আমরা মানুষ হতে পারিনি। এই জিনিসটা অনেক সময় ব্যথিত করে। শারীরিক দিক থেকে আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি মানসিকভাবে খারাপ থাকার কথা বললেন, অনুমান করছি, সাম্প্রতিক যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সম্ভবত এগুলোর প্রতিক্রিয়াতেই এমনটা ঘটছে।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: হ্যাঁ। কষ্টটা হলো, ইসলাম অত্যন্ত উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সহিষ্ণু ধর্ম; কিন্তু বর্তমানে সারা পৃথিবীতে, আমার মনে হয়, এই একটা চক্রান্তই বলব– ইসলামকে বর্বর, জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসবাদী ধর্ম হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এর জন্য যেমন ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুরা চেষ্টা করছে এবং অনেকে ইসলামের নামেও ইসলামের বদনাম করছে।

রাজু আলাউদ্দিন: এই জায়গাতেই সুনির্দিষ্টভাবে একটা কথা জানতে চাই। আমরা এই বছরই দেখলাম পাঁচজন ব্লগার হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ নীলয়। এই হত্যাকাণ্ড যারা ঘটাচ্ছে তারা মনে করছে, এই ব্লগাররা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কে কুৎসা করছে বা নবীজি (সা.) সম্পর্কে কুৎসা করছে; কিংবা এরা নাস্তিক– এটাও হত্যাকারীদের বড় অভিযোগ। এখন প্রশ্ন হলো, কেউ যদি নাস্তিক হয় তাহলে এটা তো (ইসলামের দৃষ্টিতে) অপরাধ কিংবা অন্যায় না, এটা হলো পাপ। আমি যতটুকু বুঝি আর কী? অন্যায় হলো, আপনি আমাকে যদি মারেন এটা সামাজিকভাবে একটা অন্যায়। এটা আদালতে যাওয়ার মতো একটা বিষয়, এটা পাপ, আবার এটা অপরাধ। কিন্তু আমি যদি বলি, আমি একজন নাস্তিক। এটা কি আমার অপরাধ, নাকি এটা পাপ?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: এখানে দুটি বিষয় আছে– একটা হলো, যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, তাদেরও ইসলামে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা আছে সম্মানের সঙ্গে, নিরাপত্তার সঙ্গে– এই গ্যারান্টি ইসলাম দেয় এবং আমরা দেখেছি ইসলাম এই ব্যাপারে এতখানি উদার যে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ইসলাম এসেছে, ইসলাম সোচ্চার, সেখানে এ কথা কোরআনে-কারীমে স্পষ্ট বলা আছে, “তোমরা তাদের দেব-দেবীদের নিয়ে গালিগালাজ কর না।” যুক্তি খণ্ডাতে পার, কিন্তু এই গালিগালাজ করা জায়েজ না।

এখানে ব্লগার, সবার সম্পর্কে মতামত আমি দিতে পারব না, আমি সাধারণভাবে যা দেখেছি– তারা অনেক সময় যুক্তির সীমা পার হয়ে গালাগালির পর্যায়ও চলে যায়, কুৎসা রটনার প্রতি চলে যায়। যারা এই ধরনের কাজ করে, এটা পাপও, অন্যায়ও। কাউকে গালিগালাজ করা অপরাধ। আমি বাকস্বাধীনতার কথা স্বীকার করি, কিন্তু বাক-স্বেচ্ছাচারিতা তো আমি মানতে পারি না। আপনি আমার মাকে নিয়ে যদি কিছু বলেন, বা আপনার মাকে নিয়ে কেউ কিছু যদি বলে তাহলে আপনি কি আইন দেখবেন, নাকি স্বাভাবিকভাবেই আপনি উত্তেজিত হবেন? এমনকি বাকস্বাধীনতা থাকলেও আপনি যৌক্তিকভাবেও আপনার পিতার বিরুদ্ধে, মাতার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবেন না। যুক্তিও যদি আপনার থাকে।

দেখুন, আপনি লক্ষ্য করবেন, হযরত ইব্রাহিম (সা.) ইসলামের একজন বড় নবী, তিনি যখন তাঁর পিতাকে বোঝাচ্ছিলেন, পিতার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই যুক্তি দিচ্ছিলেন, অতি সম্মান রেখে। উনার পিতা যদিও মূর্তিপূজক ছিলেন এবং মূর্তিপূজকদের একজন নেতা ছিলেন, এখানে পিতাকে অসম্মান করে কিছু বলছেন না। কিন্তু উনার বাকস্বাধীনতা উনি প্রয়োগ করছেন।

ঠিক এমনিভাবে জীবনে একটি কথা প্রতিষ্ঠিত আছে সারা পৃথিবীতে, আপনারা জানেন, একজন দার্শনিক বলেছিলেন, আমার মুষ্ঠিবদ্ধ হাতটা আমি ততদূর পর্য়ন্ত প্রসারিত করার অধিকার রাখি যতদূর পর্যন্ত আপনার নাকে না লাগে। কিন্তু আমার এই স্বাধীনতা নেই, আমার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আপনাকে গিয়ে আঘাত করবে। আমার মুষ্ঠিবদ্ধ হাতটা ওই পর্যন্ত প্রসারিত করার অধিকার আছে।

আমার মলত্যাগের অধিকার আছে। এটা স্বাভাবিক কিন্তু। তাই বলে, আমি চৌরাস্তায় বসে যদি মলত্যাগ করি, তাকে কি আমার স্বাধীনতা বলব? মানুষের সবারই স্বাধীনতা একটা স্বনিয়ন্ত্রিত অবস্থান পর্যন্ত আছে। আপনার চোখের দৃষ্টি কতদূর পর্য়ন্ত যাবে, তার নিয়ন্ত্রণ আছে। আপনার হাত কতদূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে পারেন, তার নিয়ন্ত্রণ আছে। আপনার মনন ও চিন্তার সীমা আছে। কেননা, আপনার মন-মনন-চিন্তা কখনোই আপনার যুগের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না, বা পরিবেশের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। আজ আমরা কম্পিউটার বলতে যে কথাটা সহজে বুঝে ফেলি, এটা যদি আজ থেকে বিশ বছর আগেও বলতাম, কেউ বুঝতেন? মোবাইল ফোন বলে যে জিনিসটা বুঝি, এটা যদি আজ থেকে বিশ থেকে পঁচিশ বছর আগে কাউকে বলা হয়, সে আমাকে পাগল বলত কি না?

রাজু আলাউদ্দিন: নিশ্চয়ই পাগল বলত..

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: অর্থাৎ আমার চিন্তাটা সীমিত, আমার ভাবনাটাও আমার যুগের সঙ্গে সীমিত। তো এই ‘মুক্তমনা’ বলতে, হ্যাঁ, মুক্ত, স্বাধীনতার অধিকার আপনার আছে, সেই মুক্ততারও তো একটা সীমানা আপনি নির্ধারণ করেন। আর প্রশ্রাব করার অধিকার আপনার আছে, কিন্তু কারো মুখে প্রশ্রাব করার অধিকার তো আপনার নেই।

রাজু আলাউদ্দিন: এখন ব্লগারদের যে কর্মকাণ্ড যেটা তারা হয়তো কখনো কখনো সীমালঙ্ঘন করেছে, আপনি যেটা বললেন। প্রশ্নটা হচ্ছে, সেই সীমালঙ্ঘন করার শাস্তি কে দেবে? প্রথম হচ্ছে, আপনি একটু আগেই বললেন যে এটা পাপও, আবার বাড়াবাড়ির কারণে এটা অপরাধের পর্য়ায়ও যায়। যেটুকু অপরাধ, তার জন্য আইন আছে, আদালত আছে; আর যেটুকু পাপের অংশ, যেমন– কেউ যদি নিজেকে নাস্তিক দাবি করেন সে ক্ষেত্রে এটা তো শুধু পাপ, তাই না? পাপের শাস্তিদাতা তো মানুষ হতে পারে না। পাপের শাস্তিদাতা হবেন আল্লাহ্, ঈশ্বর বা আমরা যে নামে তাঁকে ডাকি। সে ক্ষেত্রে নাস্তিকতার অভিযোগ তুলে এই হত্যাকাণ্ড, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: এটাকে আমি না কেবল, ইসলাম এটাকে কখনোই অনুমোদন দেয় না যে, আইন মানুষ নিজের হাতে তুলে নেবে। যেমন, আমি একজনকে চুরি করতে দেখলাম। ইসলামে আছে চোরের হাতকাটার বিধান আছে, কিন্তু আপনি তার হাত কাটতে পারবেন না। আপনি যদি হাত কাটেন তাহলে কী হবে? আপনি নিজে অপরাধী হয়ে যাবেন। আপনার কর্তব্য তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা। যে আইনে কাজী-ই বিচার করবেন তার হাতকাটা হবে কি হবে না, কাটার যোগ্য কি যোগ্য না। আপনি আশ্চর্য হবেন, খোদ বিচারক নিজের চোখে দেখছে কাউকে একটা অপরাধ করতে, তিনি শাস্তি দিতে পারবেন না, যতক্ষণ না সাক্ষীসাবুদ দ্বারা প্রমাণিত হয়।

রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে এরা যারা হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তা অপরাধ এবং একইসঙ্গে পাপ। কারণ, আপনি বললেন যে এটা ইসলাম অনুমোদন করে না, ইসলাম সমর্থন করে না। সে ক্ষেত্রে এরা যে ইসলামের নামে কাজগুলো করল…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: আমি বলব, প্রথম কথা হলো এরা যদি না বুঝে করে থাকে তাহলে এরা বিভ্রান্ত। এরা বিভ্রান্ত এবং দিকশূন্য হয়ে এরা বেহাল ঘুরছে। এবং যেটা ইসলামের কাজ নয় সেটাকে ইসলাম মনে করে তারা অপরাধ করছে।

রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটি শুধু এই জায়গাতেই সীমাবদ্ধ না। এটার পেছনে রাজনৈতিক বা অন্য…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: এটাই বলছি, আর যদি বুঝে করে থাকে বা তাদের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র– আমার মনে হয়, এটাই বর্তমানে সত্য। যার কথা আমি প্রথমেই বলেছিলাম। শান্তির সময়ে এবং শান্ত পরিবেশে ইসলামের যে বিকাশ ও অগ্রগতি ঘটে, কখনোই বিশৃঙ্খল অবস্থায় তা ঘটবে না। আমি আপনাকে দেখাচ্ছি, ইসলাম কত সহিষ্ণু।

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় ওরা মানে মুশরিকরা শর্ত করল যে, আপনার নামের সঙ্গে রসুলউল্লাহ লাগাতে পারবেন না। ওটা কাটেন। কুরাইশদের সঙ্গে যখন সন্ধি (চুক্তি) লেখা হচ্ছে, রাসুল (সা.) লিখতে জানতেন না, হযরত আলী (রা.) লিখতে জানতেন। তো, হযরত আলী (রা.) লিখতে শুরু করলেন। প্রথমে লিখলেন, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। এটার ওপর কুরাইশরা আপত্তি করল যে, ‘রাহমানির রাহিম’-কে আমরা চিনি না, সুতরাং এটা লেখা যাবে না। আচ্ছা মানলেন, লেখা যাবে না। কত সহিষ্ণু! তারপর যখন আবার হযরত আলী (রা.) লিখলেন, এই চুক্তিটা হচ্ছে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এবং কুরাইশদের মধ্যে। তখন তারা আপত্তি করল– রাসুলুল্লাহ লেখা যাবে না, লিখতে হবে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট। তো হযরত আলী (রা.) বললেন, এটা তো আমার বিশ্বাস, এটা আমি কী করে কাটি? রসুল কারীম (সা.) বললেন, কোন জায়গায় লিখেছ। তিনি দেখিয়ে দিলেন, রসুল নিজের হাতে কলম নিলেন, নিয়ে শব্দটা কাটলেন। কতটা সহিষ্ণুতা!

আরও শুনুন, এরপর ওরা শর্ত জুড়লেন, যদি কেউ ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় যায়, তাহলে তাকে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু কেউ যদি কোরাইশদের পক্ষাবলম্বন করে মক্কায় চলে আসে তাহলে তাকে ফেরত চাইতে পারবে না। কত অসম শর্ত! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আচ্ছা তা-ই হোক। তবুও শান্তি বজায় থাক। তাতে লাভ হয়েছে কী? মাত্র দুই বছরে ইসলাম মক্কা-মদিনার বাইরে ছড়িয়ে গেল। কারণ, মানুষ তখন বুঝতে পারল, ইসলাম কী?

আজকে যা হচ্ছে, ইসলামের নামে যে উগ্রবাদিতা, আমি তো বলব, একটা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। ইসলামের যে একটা অপ্রতিরোধ্য গতি, আজকের দিনে বলা হচ্ছে যে পঞ্চাশ বছর পর ব্রিটেন মুসলিম দেশে পরিণত হয়ে যায় কি না। এ রকম কিছু আন্দাজ করা হচ্ছে, (উত্তর) আমেরিকায় যে হারে মুসলমান বাড়ছে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর সেখানেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায় কি না।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি বলতে চাইছেন যে, এর পেছনে রাজনীতি যেমন আছে, এর পেছনে জাতিগত ষড়যন্ত্র কোনো না-কোনোভাবে, পরোক্ষভাবে বা অবচেতনে কাজ করছে, যার প্রকাশ ঘটছে রাজনীতির উগ্রপন্থার ভেতর দিয়ে?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: যারা উগ্রপন্থা করছে তারা কখনও ইসলামের পক্ষের শক্তি নয়। মুখে যতই ইসলামের কথা বলুক, কিন্তু ইসলাম এদের স্বীকৃতি দেয় না।

রাজু আলাউদ্দিন: আমি শুনেছি, তারা ‘নারায়ে তাকবির’ বলে আক্রমণটা করেছে।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: ‘নারায়ে তাকবির’ বললে ইসলাম হয়ে যাবে, তা তো নয়।

রাজু আলাউদ্দিন: না, তা নয়। আমি জানি না, এটা হয়তো সত্য, আপনি যে ব্যাখ্যাটা দিলেন, এরা ইসলামের নামে…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: হয়তো যে ছেলেটা গিয়ে হত্যা করেছে, সে হয়তো বিভ্রান্ত, কিন্তু তাকে যে পরিচালনা করছে সে ষড়যন্ত্রকারী। আপনি আইএস বলেন আর ওরা বলেন, সবাই আজকে ইসলামেরই বদনাম করছে।

রাজু আলাউদ্দিন: তা তো বটেই। শেষ পর্য়ন্ত ইসলামের বদনাম হচ্ছে। আপনি যেভাবে বললেন ঐতিহাসিক সব ঘটনার কথা, তাতে তো পরিষ্কার…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: যারা প্রথম ইসলামি জঙ্গি ছিল এদের খারিজি বলা হত। এরা তা হয়েছিল হযরত আলী (রা.)এর বিরুদ্ধে গিয়ে, যখন হযরত আলী (রা.) হযরত মাবিয়ার (রা.) সঙ্গে সন্ধি করাটা মেনে নিলেন, তখন হযরত আলীর (সা.) পক্ষের পাঁচ হাজার লোক তাঁর দল থেকে বেরিয়ে গেল এই কথা বলে যে, হযরত আলী (সা.) এখানে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করেছেন। এই সন্ধি মানা যায় না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা নিজে কোরআনে বলছেন,‘ইনিল হুকমু ইন্নালিল্লাহ’, মানে আইন একমাত্র আল্লাহর। তিনি মানুষের মতামত গ্রহণ করতে গিয়ে আল্লাহর আইনকে লঙ্ঘন করেছেন।

হয়রত আলী (রা.) বললেন, কথা তো সত্য, তোমাদের মতলবটা তো ভালো না। এরা ধর্মীয় দিক থেকে এতটা ঈর্ষান্বিত ছিল যে, আপনাকে বলি, এদের একটা দল, যারা নাকি হযরত আলীকে হত্যা করেছিল, তারা যখন উত্তেজিত হয়ে তাঁকে (হযরত আলীকে) জখম করতে গেছে তখন তিনি বললেন, তোমরা যা-ই কর আমার হাত-পা কেটে নাও, কিন্তু আমার জিহ্বাটা কেটে নিও না। কারণ, আমি আল্লাহর নাম নিতে নিতে মরতে চাই। অথচ হযরত আলী (রা.)এর হত্যাকারী সম্বন্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ওরা জাহান্নামী, মুসলমান না। কিন্তু দেখতে তো একই রকম।

আরেকটা ঘটনা বলি, হযরত খাব্বাব (রা.) বড় সাহাবী ছিলেন। ইসলামের প্রথমদিকে মুসলমান হয়েছিলেন। উনি বৌ-বাচ্চা নিয়ে এক জায়গায় যাচ্ছিলেন। উগ্রবাদীরা এক জায়গায় তাদের এরেস্ট করে ফেললেন। উনারে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আলীকে কাফের মনে কর, না মুসলমান মনে কর? উনি বললেন, আলী একজন মুসলমান। শুধু এইটুকু বলার কারণে উনার নাবালক শিশু, স্ত্রী এবং উনাকে মেরে ফেলা হলো, অর্থাৎ তাঁরা শহীদ হলেন। কিন্তু এরাই এমন লোক কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পরে জানতে পারল যে, উনাদের একজন খ্রিস্টানদের একটা শুকর এনে মেরে ফেলেছে। উনারা বললেন, জলদি এই শুকরের গন্ধ সরাও, এটা নাজায়েজ। তো একটা শুকরের প্রাণ বাঁচাতেও তারা প্রস্তুত, এখানে মানুষের প্রাণ ইসলামের নামে সংহার করতে দ্বিধা করছে না। তাহলে কতখানি অন্ধ এরা!

এই উগ্রবাদীদের সম্বন্ধে রাসুল (সা.) বলেছেন, এরা উগ্রবাদী। এদের সম্পর্কে বুখারী শরীফে আছে, এদের নামাজ দেখলে তোমার নিজেকে হেয় মনে হবে যে আমি হয়তো নামাজ ঠিকমতো পড়তে পারলাম না; এদের ইবাদত দেখলে তোমার নিজের ইবাদতকে খাটো মনে হবে; এদের চলাফেরা দেখলে তোমার নিজের চলাফেরাকে খাটো মনে হবে। কিন্তু এদের অবস্থা এমন, ইসলাম থেকে এরা এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যে ইসলামের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। উদাহরণ দিয়ে বললেন, একজন শিকারী যদি এমনভাবে তীর ছুঁড়ে মারে যে পাখির শরীর ভেদ করে চলে যায়, এরপর কেউ যদি তীরটা খুঁজে পায় তখন রক্তের একটু চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনিভাবে ওদের মধ্যে ইসলামের কোনো চিহ্নও নেই।

এই উগ্রবাদীদের সম্পর্কে রাসুল (সা.) আমাদের অত্যন্ত সতর্ক করে দিয়েছেন। এই উগ্রবাদীদের সম্পর্কে রাসুল (সা.) যা কিছু বলে গেছেন, বর্তমান উগ্রবাদীদের সম্পর্কেও তার সবকিছু খাটে। এরপরও আমরা তাদের চিনতে পারছি না। আমাদের যুবকরা বিভ্রান্ত হচ্ছে।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কি মনে হয় যুবকরা মূলত বিভ্রান্ত হচ্ছে? আমাদের রাজনীতি কি বিভ্রান্ত নাকি সচেতনভাবেই এগুলো করা হচ্ছে?

মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ: আমার কাছে মনে হয়, আমাদের দেশে যারা নাকি ইসলাম সম্পর্কে জানা লোক ছিল, এরা সচেতনভাবে ইসলামকে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এখনো তারা আমাদের স্বাধীনতাকে সহ্য করতে পারছে না, উন্নয়নকে সহ্য করতে পারছে না। তারা সচেতনভাবেই এর অপব্যবহার করছে। কিন্তু যারা জড়িত হচ্ছে তারা হলো বিভ্রান্ত।

রাজু আলাউদ্দিন: এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অবস্থান আপনার কাছে কী রকম মনে হয়–এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে?

মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ: হত্যাকাণ্ড তো অবশ্যই নিন্দনীয়। ইসলামের দৃষ্টিতেও নিন্দনীয়। একজন নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা করা তো একটা সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব। আমি বলব সরকার বাহ্যত, আমি তো জানি না– (সরকার) কী করছে না করছে– এই নিরাপত্তা দেওয়ার পর্যায়ে তারা নেই। দ্বিতীয় বিষয় হলো, সরকারের হয়তো বা গাফিলতি বলবো না– সীমাবদ্ধতা আছে। বর্তমান সরকারের জন্য তো ১৬ কোটি মানুষ, সেখানে কয়েক হাজার লোকের জন্য একজন পুলিশ– মনে হয় তাদের পক্ষে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব না। সবচেয়ে বেশি উচিৎ হবে, সরকারের চেয়ে মানুষের সচেতনতা। আজকে পাঁচতলায় উঠে একটি লোক মানুষকে হত্যা করছে। তাদের মেরে তারা নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে।

রাজু আলাউদ্দিন: আবার কিলিংয়ের সময় এগিয়েও আসছেন না কেউ…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: হ্যাঁ, চিৎকার করার পরও কেউ এগিয়েও আসছে না।

রাজু আলাউদ্দিন: এই পরিস্থিতিটা আসলে আরও বেশি ভয়াবহ…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: হ্যাঁ, এটা বলছি, এই পরিস্থিতিতে সরকার করবেটা কী? যদি দশ হাজার পুলিশও সরকারের কাছে থাকে তা দিয়ে তো আর ঘটনার মুহূর্তে গিয়ে থাকবে না।

রাজু আলাউদ্দিন: পরে গিয়ে কী করবে? যারা উপস্থিত থাকল, যাদের সাহায্য করার কথা ছিল, তারা এগিয়ে না এলে… এই জায়গায় একটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে, এই যে মানুষের মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না, এর পেছনে কোন কারণগুলোকে আপনি বেশি দায়ী মনে করেন?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: এটার জন্য আমি আমাকেও দায়ী করি এবং আমি সংবাদমাধ্যমকেও দায়ী করি। এই হিসেবে যে, আমি একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি। আমি ধর্মীয় বিষয়টাকে যদি আরও সুচারুভাবে তুলে ধরতে পারতাম মানুষের মধ্যে তাহলে মানুষ নিশ্চয় সচেতন হত। আমার দ্বারা মানুষের সচেতনতা যতখানিই হবে সরকারের কোনো আইনই ততটা পারবে না। আপনি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, আপনি কথাটা আরও বেশিভাবে মানুষের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তো যেতে পারছি না। সব সময় আমি আপনাকে কথাগুলো বলছি। আপনি কথাটাকে হাজার লোকের কাছে নিয়ে যাবেন। আমরা যেমন, মিডিয়াও তেমনি, আমার মনে হয় বিষয়টা যথাযথভাবে নিয়ে যেতে পারছি না।

এই জিনিসটাই এমন– ধর্মের প্রতি আঘাত করা হলে আপনিও উত্তেজিত হয়ে যাবেন। বুঝেছেন ব্যাপারটা? এই ব্যাপারে আমাদের পুলিশের আইজি শহীদুল হক সাহেব যে আবেদনটা জানিয়েছেন, এই আবেদনটাকে আমি কিন্তু সমর্থন করি। আইজি সাহেব বললেন যে, ব্লগারদেরও স্বসীমায় থাকা দরকার। আমার কথাটা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে, তিনি এ-ও বলেছেন, এই দেশে কিন্তু হত্যাকাণ্ড বিষয়ে আইন আছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিৎ না– চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড আছে। তাই যে কোনোভাবেই হোক, কেউ যেন ক্ষুদ্ধ না হয়– এসব ব্যাপারও তিনি বলছেন।

রাজু আলাউদ্দিন: তবে উনার এ কথাও বলা উচিত ছিল যে, আপনি যেটা বললেন, সেসব বিষয়ে মানুষ সহজেই উত্তেজিত হয়। মূল কথা হচ্ছে, আমাদের সহিষ্ণু হতে হবে। তবে উনার আরো বলা উচিত ছিল যে, মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতা আরো বাড়ানো উচিৎ। আপনার কোনো কিছু, চিন্তা যদি অস্বস্তির কারণ হয়, ভুল মনে হয়, তাহলে চিন্তা দিয়েই তাকে প্রতিহত করতে হবে। গায়ের জোরে প্রতিহত করি যদি…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: গায়ের জোরে কোনো চিন্তাকে আজ পর্যন্ত প্রতিহত করা যায়নি।

রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস হলো, এখন প্রচলিত যে মাদ্রাসা আছে সেখানে যারা শিক্ষাদান করছেন, তাদের যোগ্যতার বিষয়টা জানতে চাই। মাদ্রাসাতে যে ধরনের বই, যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে– সমাজে এই শিক্ষা কি ধরনের ভূমিকা রাখছে?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: একজন মাদ্রাসাছাত্রের প্রধান কাজ হলো নীতি ও নৈতিকতা বোধকে জাগ্রত করা, সমাজের প্রাণকে জাগ্রত করা। এখন ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলো এতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, যতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে, এদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলবো না, তাতে উনারা আবার গোসা হবেন।

রাজু আলাউদ্দিন: আমি একটা জিনিস দেখেছি, সেটা হলো কওমি মাদ্রাসার বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শেখ মুজিবর রহমানের নামই নেই।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, তিনি আবার বলছেন আমরা জেনেশুনেই এটা লিখছি।

রাজু আলাউদ্দিন: আমি সেটাই তো বলছি, সরকারের নিয়ন্ত্রণ যদি থাকত তাহলে কিন্তু এটা ঘটতে পারে না।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: সেটাই বললাম, এই মাদ্রাসাগুলো যারা চালাচ্ছে তাদের ইচ্ছামতোই এগুলো চলছে। যার কারণে এই মাদ্রাসা ওই মাদ্রাসার মধ্যে মিল খুব কম।

রাজু আলাউদ্দিন: মানে ‘স্টেট উইদিন স্টেট’, রাষ্ট্রের মধ্যে ওরা আরেকটা রাষ্ট্রের কল্পনা করে ওরা নিজেদের ইচ্ছেমতো চালাচ্ছে?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: শুধু এইটুকুই না, আপনি আশ্চর্য হবেন এটা জেনে যে, পারিবারিক চিন্তা যেমন হয়, মাদ্রাসাও তেমন; কয়েকটি মাদ্রাসা মিলে একটি পরিবার।

ধরুন, আপনি একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, আপনার যে রকম আদর্শ ওই আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটে ওখানে। আমি একটা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, আমার মাদ্রাসা আমার আদর্শের। কিন্তু আমার আপনার মধ্যে চিন্তার যে মিল, ভালো ভাবনার যে সমন্বয়, এই সমন্বয়টা আমার আপনার মধ্যে নেই। এ জন্যই আমরা প্রস্তাব করেছিলাম, মাদ্রাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি করার জন্য না হলেও সমন্বয় সাধনের জন্য এগিয়ে আসা উচিৎ। মাদ্রাসার কিন্তু সিলেবাস আছে। এই যে আপনাকে যে ঘটনাটি বললাম এটা কিন্তু সিলেবাসে আছে। এটা কিন্তু পড়ানো হয়। কিন্তু ওই আঙ্গিকে পড়ানো হয় না যে এর রেজাল্টটা ছেলেদের মনে পরিবর্তন আসবে।

রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে কথাগুলো বইয়ের মধ্যে আছে। কিন্তু বই থেকে ওই ছাত্রের মধ্যে, কী ভেতরে…

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: পাকিস্তান আমলে ইউনিভার্সিটিগুলোতে সমাজতন্ত্র নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পাকিস্তান আমলেই ছাত্রদের মধ্যে সমাজতন্ত্রের ভাবধারা সবচেয়ে বেশি ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর সমাজতান্ত্রিক হওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ বেশি হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিজম, সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ফ্লপ করছে। ব্যাপারটা হয়ে গেছে আসলে উল্টো।

এই দেশে যতই ব্লগাররা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চাইছে অন্য পক্ষ ততই ইসলামের নামে উত্তেজিত হচ্ছে, তারা মানুষ মারছে। এ দিক দিয়ে যদি ব্লগাররা সহিষ্ণু হতো, আর আমরাও সহিষ্ণু হতাম তা হলে সমাজে কিন্তু এই বিশৃঙ্খলা দেখা দিত না। যে জন্য আপনাকে এই কথা বলছিলাম, সহিষ্ণুতা আনা দরকার।

আমি একটা ঘটনা আপনাকে বলব যে রাসুল (সাঃ)-এর সহিষ্ণুতা কতখানি ছিল। একজন ইহুদি রাসুল (সা.)-এর নিকট টাকা পেতেন। এটার একটা নির্ধারিত মেয়াদ ছিল যে, এতদিন পরে এসে উনি টাকা নিয়ে যাবেন। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ ফুরানোর বেশ আগেই তিনি রাসুল (সা.)-এর নিকট আসলেন। এসে টাকা চাওয়া তো দূরের কথা, বাড়াবাড়ি শুরু করলেন। এই রকম তোমরা, এই করো তোমরা, আরবরা এই রকম– নানা কথা বলতে লাগলেন। এমনকি রাসুল (সা.)-কে বংশ তুলে গালিগালাজ করতে লাগলেন। রাসুল (সা.)-তো হাসছেন। আসশপাশে যাঁরা সাহাবী ছিলেন তাঁরা তো উত্তেজিত হয়ে গেলেন, এমনকি হযরত উমর (রা.) তো খুব উত্তেজিত হয়ে গেলেন। হযরত উমর (রা.) বললেন যে, রাসুল (সা.), আপনার কাছে ও টাকা পেতে পারে তাই বলে গালিগালাজ করার তো অধিকার নেই। আপনি শুধু অনুমতি দেন তো আমি ওর কল্লাটা নিয়ে আসি। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মদিনার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আর ওই ইহুদি তখন প্রজা।

রাসুল (সা.) তখন বলছেন, তুমি (উমর) তো অন্যায় করেছ, সে আমার কাছে টাকা পায়। সুতরাং তার কথা বলার অধিকার আছে। তুমি বরং আমাকে বলতে পারতে, আপনি জলদি কী করে পারেন তার টাকা দিয়ে দিন। তুমি তার টাকা আদায় করে দিতে পারতে। আর এই যে তুমি তাকে ভয় দেখালে এ জন্য তাকে অতিরিক্ত এত টাকা দিয়ে দাও। কারণ, তাকে ভয় দেখানোর কোনো অধিকার তোমার নেই। এরপর ওই ইহুদি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ে পড়ে গেছে– আমি বুঝেছি ইসলাম সত্যধর্ম। এখন বুঝতে পারছেন, এই সহিষ্ণুতা– এটা পোক্ত না হলে তো হচ্ছে না।

রাজু আলাউদ্দিন: এই জন্যই বলছিলাম, পুলিশের আইজি সাহেবের বলা উচিত ছিল– উনি যেটা বলছেন সেটা অবশ্যই সত্য, কিন্তু কোন সত্যটি প্রাধান্য পাবে সেটা কিন্তু বিষয়। এখন আইজি সাহেব যেটা বলেছেন, সেটা কিন্তু পরোক্ষভাবে ব্লগারদের হত্যার একটা বৈধতা দেওয়া হয়ে যায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে সহিষ্ণুতার অভাব। সহিষ্ণুতা বাড়ানো দরকার, কিন্তু এই বাড়ানোর জন্য কি করতে হবে, সেরকম কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ আছে কি না আপনার?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: আমার মনে হয়, আমাদের দেশে যারা ‘মুক্তমনা’ বলে নিজেদের ধারণ করে তারা মানসিক বুদ্ধিবৃত্তিতে পড়াশোনায়, জ্ঞানে এতটা বিকশিত হননি। কারণ, জ্ঞান মানুষের যত বৃদ্ধি পায় তত সে বিনয়ী হয়, তত সে সহিষ্ণু হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যাঁরা পড়ালেখা করছেন, তাঁরা ইসলামের জাজমেন্টকে ঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারছেন না। এঁদেরও ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা কম। যে কারণে বলব, সহিষ্ণুতা সৃষ্টির জন্য নিজেদের জ্ঞানের বিকাশ করা দরকার। কিন্তু জ্ঞানের বিকাশ নেই। এবং সেই জ্ঞানটা যেন একমুখী না হয়, বিবিধমুখী জ্ঞান বাড়ানো দরকার। বিবিধমুখী জ্ঞান যত বাড়বে তার ভেতর সহিষ্ণুতা তত বাড়বে। আমার মনে হয়, বর্তমানে শুধু এ ক্ষেত্রে নয়, গোটা সমাজটাই অসহিষ্ণু হয়ে গেছে। তার প্রধান কারণ হলো, মানুষের জীবন-জীবিকা– জীবন পরিচালনায় টেনশন। মানুষ সারাক্ষণ টেনশনের মধ্যে বেঁচে আছে। যার অর্থকড়ি আছে সেও টেনশনে আছে, যার অর্থকড়ি নেই সেও টেনশনে আছে। এই টেনশনটা থাকার কারণে মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।

এই যে দেখুন, আজকে আমাদের দেশে আইনমূলকভাবে তালাকের মাত্রাটা বেড়ে গেছে। এটার মূলে কিন্তু একই কারণ– টেনশন। আজকের দিনে সমাজের সব শ্রেণির– আমার উদাহরণটা, দুই হাত জোড় করে বলছি, শুধু আপনার জন্য, আপনি চাইলে কেটেও দিতে পারেন– আজকাল এরকম অবস্থা হয়ে গেছে একটা কুকুর আরেকটা কুকুরের প্রতি যেমন করে। একটা কুকুরকে একজন ছুঁয়ে গেছে, দূর দিয়ে আরেকটা কুকুর যাচ্ছে, এটা দেখে খামোখা খ্যাঁক করে ওঠে। আজকে আমাদের অবস্থা সমাজে এ রকম হয়ে গেছে, আরেকজনকে দেখলে ‘খ্যাঁক’ করে উঠি। অসহিষ্ণুতা এতটা বেড়েছে। তাই টেনশন কমানো দরকার। এই টেনশন কমানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেমন আছে এবং যারা সামাজিক নেতৃত্বে আছেন– সুশীল সমাজ, ওলামা একরাম তাঁদেরও দায়িত্ব আছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

আগের দিনে মানুষের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। আমি বাড়িতে এলে মা আমার গালে চুমু খেয়েছে, আমার দাদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে, আমার বোনরা আমার জন্য দস্তরখানা বিছিয়ে দিয়েছে। কত মায়া আমার জন্য তাদের। ঘরে এসে আমি কী পেয়েছি– মায়া, কত মায়া! বাইরে থেকে আমি যত টেনশন নিয়ে আসি, এখানে এলে সব ‘নেই’ হয়ে যায়।

কিন্তু আজকের দিনে একটা ছেলে স্কুল থেকে এসে কি দেখছে– মা অফিসে, বাবা অফিসে, ভাই-বোন অফিসে, আছে শুধুমাত্র একটা গৃহকর্মী। গৃহকর্মী তার মনকে জানে না, মনকে বোঝে না। দেখা গেল, কাজের মেয়ে তার জন্য এক গ্লাস দুধ নিয়ে আসে, সে জানে গ্লাসে দুধ আছে, খাওয়া ভালো, তাই খায়। এই যে একটা পরিবেশ হচ্ছে আমাদের।

পাশ্চাত্যে প্রথমে পরিবারব্যবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ভেঙেছে। তার কারণে পরিবার ব্যবস্থাটা ভাঙার পরও বিকল্প পেয়েছে। আমাদের কী হয়েছে? আমাদের দেশে পূর্বের অবস্থানটা একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে। এক চান্সে লাফ মেরেছি। একটা সিচুয়েশন থেকে, ফ্যামিলি বা পরিবারিক পরিবেশ থেকে চট করে বদলে গেছি। চট করে বদলে যাওয়ার কারণে এটা সহ্য করতে করতে যে যাবো, তা আমাদের হয়নি। যার কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা বেশি। তাই দেখবেন আমাদের সমাজটা অত্যন্ত অসহিষ্ণু। কিছু একটু হলো কী, এটা ওটা আছড়ে দিল, ছোট বোনটাকে কামড়ে দিল, পিঠে কিল বসিয়ে দিল। এটা ঠিক হলো কি হলো না, তা ভাবছে না। দেখবেন মা-বাবার সম্পর্ক থেকে সে অনেক দূরে। তখন মা-বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখন তাবিজের জন্য আসে আমাদের কাছে। কেন তাবিজ দেব? বলেন যে, আমার মেয়ে যেন কেমন করে। আমি জিজ্ঞেস করছি তোমার বয়স কত? বলে, তেরো। আমি বলি, তুমি তেরো বছর পর এসেছ তাবিজ নিতে!

একটা সন্তানকে পাওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি যে সাধনা– সেটা আমাদের ফ্যামিলিতে নেই। দেখা যায় হঠাৎ করে মা সন্তান নিচ্ছেন। এর ফলে মা টেনশনে ভোগেন।

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। একটা জিনিস জানতে চাই– জুমার দিনগুলোতে মসজিদে– আমি শুনেছি– যে ভাষণ দেওয়া হয়, সেখানে নৈতিক উন্নতির পরিবর্তে অনেক রকম বিদ্বেষমূলক কথা বলা হয়। যেমন আপনি যে ইহুদীদের সঙ্গে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যে সম্পর্কের, তাদের সঙ্গে যে আচরণের কথা বললেন– সেটার সঙ্গে কোনোভাবে মেলে না। আমি দেখেছি, অনবরত ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বিধর্মীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। শুধু ইহুদি না, ইহুদি-খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। এগুলো কি কোনোভাবে আমাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে না?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: হ্যাঁ, করছে। প্রথম কথা হলো, আমাদের মধ্যে ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে। মায়া হারিয়ে যাচ্ছে, মমতা-সহানুভূতি-সহমর্মিতা হারিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য আমরা দায়ী। এর জন্য সরকারও দায়ী। আমার ছেলেটা শিখছে না– এর জন্য আমাদের সামাজিক ঔদার্য্য বন্ধ হয়ে যাওয়া দায়ী। সুশীল সমাজে একজন আবুল ফজল, ফজলুল হক– এঁরা নেই। ওই সময় সামাজিক যে সেতু যে ভিত্তি ছিল তা খুবই সহিষ্ণু ছিল। সে সহিষ্ণুতা জ্ঞানে, প্রজ্ঞানে। বর্তমানে রাজনীতির জন্যই অনেক সময় অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।

আগের দিনে মানুষ অনেক বেশি কল্যাণধর্মী ছিলেন। এখন শুধু মাত্র নিজের স্বার্থের জন্য একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, ফ্যাঁসাদ করছে। সেই কল্যাণধর্মীতা নেই। এ জন্য গোটা সামাজিক নেতৃত্বকে দায়ী করা যায়।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যেটা বললেন, আবুল ফজল বা ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কথা– এখন সেই জায়গাগুলোতে একটা সংকট-সমস্যা আছে।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: জানেন, শের-এ-বাংলা কে ছিলেন, চিত্তরঞ্জন দাশ কে ছিলেন– এঁদের চেনে না আজকের ছেলেমেয়েরা। আমি কাউকে হেয় করে বলছি না। কেউ কেউ বড় করে দেখাচ্ছে মেজর জিয়াকে, কেউ কেউ দেখাচ্ছেন শেখ মুজিবকে বড় করে। আমি এদের হেয় করছি না। কিন্তু খুব বড় অর্থে কি তাদের দেখানো হচ্ছে? আমার মা আমাকে বিশেষ করে বলতেন, দেখ বাবা, শের-এ-বাংলার বিরুদ্ধে কখনো কিছু বল না। উনি বড় মানুষ। তো আমাদের সময় এই যে আইকনগুলো ছিল, এখন বাংলাদেশের আইকন কে? মুস্তাফিজ? এই যে দুইটা বল ছুঁড়েই আইকন হয়ে গেছে। এদের প্রভাব কিন্তু পড়ছে। ক্রিকেটকে আমি ছোট করে দেখছি না। তাহলে এরা মওলানা আবুল কালাম, স্যার জগদীশচন্দ্র বসুকে কোথায় পাবে?

মেসি বা নেইমার– ফুটবলে ভাল করে লাথি দিতে পারে, সে-ই হয়ে গেছে কোটি-হৃদয়। তাহলে আইনস্টাইন হবে কী করে? এখন আইনস্টাইনের সেই আলোচনা নেই, মেসি আর নেইমারের যে আলোচনা আছে। আজকে সালমান খানকে যতটুকু চেনে ততটুকু আইনিস্টাইনকে কে চেনে?

রাজু আলাউদ্দিন: তো বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য যদি বলেন?

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: বর্তমানে সামাজিক অস্থিরতার পেছনে যুগে যুগে অশিক্ষা-কুশিক্ষা ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের আমি দায়ী মরে করি। যতক্ষণ পর্যন্ত সামাজিক ব্যক্তিত্ব সচেতন না হবে, মানুষ সচেতন না হবে, শিক্ষার বিকাশ না ঘটবে এবং দারিদ্র্য দূর না হবে; ততদিন পর্যন্ত আমার মনে হয় না সামাজিক অস্থিরতা দূরে হবে। আজকে উগ্রবাদিতার নামে যে অস্থিরতা কালকে আরেক নামে অস্থিরতা তৈরি হতেই পারে। এই অস্থিরতা দূর করতে হলে এই তিনটা কম্পোনেন্ট এখন বেশি জরুরি। এক. শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণ ও বিকাশায়ন। শিক্ষা শুধু শিক্ষা নয়, শিক্ষার মাধ্যমে মানসিক বিকাশ নিশ্চিত হতে হবে। দ্বিতীয়টা হলো, মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আরেকটা হলো সামাজিক নেতৃত্বের সচেতনতা।

রাজু আলাউদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

মওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ: শুকরিয়া।

(সাক্ষাতকার গ্রহণের তারিখ ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট।)

নিউজ ডেস্ক : আপডেট, বাংলাদেশ সময় ১০:৩০ এএম, ২ আগস্ট ২০১৬, মঙ্গলবার
ডিএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে চাঁদপুরের কাঁচা ধান

দু’দিনের ...