খোয়াব

লোকটা কেমন নিষ্ঠুরের মতো দশ বছর বয়সী শিশুটিকে গাছের সাথে টানিয়ে এক এক করে শরীর থেকে চামড়া আলাদা করছে।

প্রথমে ডান হাত কাটতেই শিশুটির আত্মচিৎকারে আকাশ মাটি সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। তারপর বাম হাত, ডান পা, এবং বাম পা টি কাটা হলো তবুও শিশুটির দেহ থেকে প্রাণ আলাদা হয়নি। তখনো সে মা-মা বলে চিৎকার করছে।

লোকটি এক এক করে শিশুটির শরীর থেকে বিভিন্ন অঙ্গ পতঙ্গ আলাদা করার পর যখন তার গলায় ছুরি ঠেকালো তখন আর শিশুটির কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। সে শুধু নিষ্ঠুর লোকটির দিকে মায়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো যেনো নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। অস্পষ্ট সুরে পাষান লোকটির উদ্দেশ্যে শুধু একবার বললো-অমাকে একটু পানি দিবেন?

লোকটি ছোট্র একটি পাত্র নিয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি ডোবা থেকে তাকে কয়েক ফোটা পানি দিয়ে গলায় ছুরি চালাতে লাগলো। শিশুটির দেহ থেকে মুন্ডুটা টপ করে মাটিতে পড়তেই, না বাবা, না বলে চিৎকার করে উঠে রহমত উল্ল্যাহ।

শোয়া থেকে বিছানায় উঠে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে কি যেনো খুঁজতে লাগলো। হাত বাড়িয়ে বাতির সুইচ অন করে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত প্রায় দু’টোর কাছাকাছি।

রহমত উল্ল্যাহ মনে মনে দোয়া-দুরুদ পড়তে লাগলো। এ কেমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলো সে। বুকের ভেতরটা কেমন ধড়পড় করছে। মুন্ডু কাটা ছেলেটি কে? আর লোকটিই বা কেনো এমন জানোয়ারের মতো শিশুটিকে হত্যা করলো? নানান কিছু ভাবতে থাকে রহমত উল্ল্যাহ।

ঘুমের ঘরে একা একাই আবল তাবল বকতে লাগলো। সকাল হতেই রাতের এমন অদ্ভুত স্বপ্নটি নিয়ে সে আবারো ভাবতে লাগলো। কাজেকর্মে ঠিকমতো মন বসছে না। চিন্তিত হয়ে মনে মনে ভাবছে এ কি আশ্চর্য ধরনের স্বপ্ন দেখলাম আমি ?

রহমত উল্ল্যাহ বিগত সাত বছর হলো বিয়ে করেছে। তার ঘরে ও পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়ে আছে। খুব পাকনা পাকনা কথা বলে। মেয়ের কথা শুনে খুশিতে বুক ভরে যায়।

প্রথম যখন তার স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ার কথা শুনলো রহমত উল্ল্যাহ, তখন তার আনন্দ যেনো মনে ধরছিলো না। বাবা হওয়ার আনন্দে স্ত্রীর প্রতি অনেক যতœবান হতে লাগলো। তারপর কয়েক মাস পেরুতেই ছেলে নাকি মেয়ে সন্তান হবে তা নিয়ে কৌতূহল জাগলো তার মনে।

রহমত উল্ল্যাহ বিয়ের আগে থেকেই তার সংসার জীবনে প্রথম ছেলে সন্তানের আশা করছিলেন। কিন্তু বিধাতার লিখন কেউ মুছতে পারেনা।

কন্যা সন্তান হওয়ার পর তার সে আশা ভঙ্গ হয়ে যায়। কন্যা সন্তান হওয়ায় প্রথমে তার ভীষন মন খারাপ হলে ও যখন নিষ্পাপ শিশুটিকে তার সামনে আনা হলো তখন তার চাহনিতে যেনো পৃথিবীর সব কিছু ভুলে যায় রহমত উল্লাহ। সেই থেকে সে ছেলে সন্তানের কথা ভুলে কন্যা সন্তানকেই ভালোবাসতে লাগলো। সন্তানের প্রতি অসীম ভালোবাসায় তার নাম রাখলো স্নেহা।

কাল রাতের এমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে বার বার তার স্নেহার কথা মনে পড়ছে। বহুদিন হয় দেখেনি তার সেই নিষ্পাপ ফুলের মন ভুলানো হাসি। কতোদিন হয় তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার মুখে চুমু খাওয়া হয়নি। তাকে দেখতে আজ খুব ইচ্ছে করছে। স্নেহার কথা মনে পড়তেই সব কিছু রেখে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো রহমত উল্যাহ।

দীর্ঘ ছয় মাস পরে বাবাকে কাছে পেয়ে রহমত উল্ল্যাহর কোলজুড়ে বসে স্নেহা বাবার কপালে , ঠোটে , মুখে চুমু খেতে খেতে আধো আধো স্পষ্ট কণ্ঠে বলে, ‘আব্বু তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? তুমি কি আমার কথা ভুলে গেছো? তুমি আমারে অনেক গুলো মজা কিনে দিবে।’

মেয়ের কথা শুনে রহমত উল্ল্যাহ স্ত্রী নাইমা বেগমকে ডাকলোÑ এই নাহি তোমার মেয়ে দেখছি ভালোই কথা বলতে শিখেছে। ওর জন্য কিছু খাবার এনেছি ব্যাগে রাখা আছে জলদি দাও।

নাঈমা বেগম ব্যাগ থেকে খাবার আনতে গেলো। খাবারের কথা শুনে স্নেহার বাবার কপালে চুমু খেতে খেতে আবারো অস্পষ্ট স্বরে বলতে লাগলো, ‘আব্বু তুমি অনেক ভালো, আম্মু পঁচা। তুমি আমাকে রেখে আবার চলে যাবে? তুমি চলে গেলে আমি কাঁদবো, তুমি যাবে না।’

মেয়ের কথায় পরাণ ভরে যায় রহমত উল্ল্যাহর। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনাবরত আদর করতে লাগলো। তারপর সারাদিন মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বিভিন্নস্থানে ঘুরে বেড়ানো শেষে বাড়ির পথ ধরে হাটতে লাগলো।

দেখতে দেখতে তিন দিন কেটে গেছে। আর এ তিন রাতেও সেই ভয়ংকর স্বপ্নের কথা ভুলেনি রহমত। ঘুমের ঘরে যখন সে স্বপ্নের কথা মনে হয় তখন যেনো সে কি হারানোর ভয়ে ছটপট করতে থাকে। বিছানা থেকে উঠে বসে প্রাণপ্রিয় মেয়ে স্নেহার মুখের দিখে তাকিয়ে থাকে।

আজ রাতেও স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই বিছানা থেকে উঠে বসে মেয়ের মুখের দিকে অধীরে তাকিয়ে আছে।

হাত দিয়ে মুখের ওপর আদরের পরশ বুলিয়ে চুমু খেতেই স্ত্রী নাঈমা বেগম সজাগ হয়ে বলে তুমি কি পাগল নাকি ঘুমের মধ্যে বাচ্ছাদের চুমু খেতে নেই। তাহলে সে সন্তান অনেক রাগী হয়। রাত অনেক হয়েছে তুমি ঘুমাওনি? না নাহি ঘুম আসছেনা। কেনো কি হয়েছে তোমার? কাল চলে যাবো তো তাই তোমাদের ছেড়ে যেতে কেনো জানি মন চাইছেনা।

স্ত্রী বললো, তোমার কথা শুনে মনে হয় তুমি আমার কাছে কিছু একটা লুকাচ্ছো, খুলে বলোতো কি হয়েছে তোমার?
না কিছুই হয়নি। ঘুমিয়ে পড়ো।

ব্যাস্ত শহরের অলিতে গলিতে হাজারো মানুষের কোলাহল। মানুষের ভিড় ঠেলে রাস্তার ফুটপাতের পথ ধরে হাটছে রহমত উল্লাহ। শহরের কোলাহলের দিকে কোন ধ্যান নেই তার। শহরে পা রাখলেও তার মনটা পড়ে আছে সেই আপন ঠিকানায়। যেখানে তার বুকের ধন রয়েছে। শহরের এই পরিবেশে পা রাখার পর থেকেই স্নেহার কথা তার ভীষন মনে পড়ছে। মনে পড়ছে সেদিনের সেই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা।

কর্মব্যাস্ততা শেষে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে স্ত্রী নাঈমার সাথে কথা বলার জন্য মোবাইলের বাটন চাপলো। কি খবর তোমার কেমন আছো? ভালো, তুমি এবং আমার স্নেহা মা মণিটা কেমন আছে ? ভালো।

তুমি যাবার পর থেকেই বার বার শুধূ তোমার কথা বলছে আর কান্না করছে। নাঈমা বাড়ি থেকে আসার পর আমার কাছে ও ভালো লাগছে না। স্নেহার কথা বার বার মনে পড়ছে। আমার মন চায় তোমাদের কাছে চলে আসতে। মোবাইলে বাবার কথা শুনে মায়ের হাত থেকে মোবাইলটি টেনে নেয় স্নেহা। অস্পষ্ট বাবাকে বলে, আব্বু তুমি কোথায় আমি যে তোমাকে দেখিনা, আমি তোমার জন্য কান্দি। তুমি মজা নিয়ে আমার কাছে আসবা না আব্বু?

মেয়ের কথায় চোখে জল আসে রহমত উল্ল্যাহর। ইচ্ছে করে এক্ষুনি তার প্রাণ পাখিটারে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে। এভাবেই এখন প্রতিদিন মোবাইলে কথা বলা হয় মা মেয়ের সাথে। কাটে দিন কাটে রাত শুধু দু’চোখ ভরে কাছ থেকে দেখা হয়না তার কলিজার টুকরো ¯েœহা আর স্ত্রীকে। দেখতে দেখতে আরো একটি বছর পার হলো।

রাত প্রায় তিনটা পৃথিবীর সবাই যখন গভীর ঘুমের ঘরে বিভোর তখনো রহমতের চোখে একফোটা ঘুম নেই। আজ রাতেও এক অদ্ভুত স্বপ্ন এসে তার চোখের পাতা ছুঁয়ে গেছে। এ স্বপ্নটা আরো বেশি দুঃস্বপ্ন। কে যেনো তার পরানের পরান, স্নেহা মা মণিকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন ছটপট করছে। স্বপ্ন দেখার পর ঘুমানোর বহু চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারেনি। স্ত্রী নাঈমার নম্বরে কল করতে চাইলেও মোবাইল বন্ধ থাকায় তা পারেনি।

পরের দিন স্ত্রীর নম্বরে কল করলো Ñ নাঈমা আমার দিনগুলো তেমন ভালো যাচ্ছেনা। স্নেহা কেমন আছে? ওর কাছে দাও আমি স্নেহা সাথে কথা বলবো।

স্বামীর কথায় চাপা কন্নায় ভেঙ্গে পড়ে নাঈমা বেগম। কথার পাস কাটিয়ে বললো, স্নেহা ঘুমাচ্ছে ,তুমি পরে কল দিয়ে ওর সাথে কথা বলো। স্ত্রীর কথা শুনে লাইন কাটলো রহমত। প্রায় একঘন্টা পর আবারো কল করলো। এবারো মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলে নাইমা বেগম বুকের ভেতরের কষ্টটাকে পাথর চাপা দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো তোমার মেয়ে এখন বাহিরের বাচ্চাদের সাথে খেলায় ব্যাস্ত। স্ত্রীর কথাগুলো ভালো ঠেকছেনা রহমত উল্ল্যাহর কাছে। নাঈমা বেগমকে কিছু না জানিয়েই পরদিন গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।

কতো আনন্দ আজ রহমতের মনে, বহুদিন পর আবার তার প্রাণ পাখিটারে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করবে। তার অস্পস্ট সুন্দর সুন্দর কথাগুলো নিরব হয়ে শুনবে। বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখতেই দুর হতে মনে মহা আনন্দ নিয়ে মেয়েকে ডাকতে লাগলো স্নেহা, মা তুমি কোথায় ?

ঘর থেকে বেরিয়ে এসো মা, দেখো বাবা তোমার তোমার জন্য কতসব মজা নিয়ে এসেছি। আমার মা মণি কোথায়? দেখো বাবা তোমার জন্যে অনেক খেলনা এনেছি। স্বামীর গলার কন্ঠ শুনেই আতকে উঠে নাঈমা বেগম। নামাজের বিছানায় বসে তসবিহ গুনছে আর তার দু’চোখ বেয়ে ঝরছে শ্রাবন ধারা।

মেয়ের কোন সারা শব্দ না পেয়ে রহমত উল্ল্যাহ নাঈমা বেগমকে জিঞ্জেস করলো- কি ব্যাপার নাহি আমার ¯েœহা মা মণিকে দেখছি না যে? ও কোথায় ? স্নেহার কথা শুনতেই স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো নাঈমা বেগম। রহমত হতভম্ব হয়ে বললো কি হয়েছে স্নেহা? ও কোথায় ? নাঈমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বললো, তোমার মেয়ে ঘুমাচ্ছে।

তার এ ঘুম আর কোনদিন ভাঙ্গবেনা গো। আমার মা আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। আমরা এখন কি নিয়ে বাঁচবো ? কে তোমাকে বলবে খেলনা আর মজা এনে দেওয়ার কথা? তোমার মেয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে!

কথাটা শুনতেই আত্মচিৎকারে কবরস্থানের দিকে দৌড়াতে লাগলো রহমত উল্ল্যাহ…।

: আপডেট, বাংলাদেশ সময় ২:০০ পিএম, ১ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার
ডিএইচ

About The Author

লেখক- কবির হোসেন মিজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

হাজীগঞ্জে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা

চাঁদপুরের ...