Home / বিশেষ সংবাদ / আমি মরি, তাও ভালো…

আমি মরি, তাও ভালো…

মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার নেন। সাক্ষাৎকারটি ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনে ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়।

ভারত সরকারের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস’ এ বঙ্গবন্ধুর এ সাক্ষাৎকারের অনুলিখন সন্নিবেশিত হয়েছে। লেখক সরদার ফজলুল করিম ইংরেজি অনুলিখনের কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এটি সরদার ফজলুল করিমের ‘রুমির আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ বইয়ে স্থান পেয়েছে।

সেই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো-

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনি সেই রাতের কথা বলুন। সেই রাত, যে রাতে একদিকে আপনার সঙ্গে যখন আলোচনা চলছিল, সেই আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল। সেই রাতের কথা বলুন, ২৫ মার্চ রাত ৮টা, আপনি আপনার বাড়িতে ছিলেন, সেই বাড়ি থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী আপনাকে গ্রেফতার করেছিল। শুনেছিলাম টেলিফোনে আপনাকে সাবধান করা হয়েছিল যে, সামরিক বাহিনী অগ্রসর হতে শুরু করেছে। তারপরও আপনি আপনার বাড়ি ত্যাগ করলেন না। আপনি গ্রেফতার হলেন? কেন আপনি নিজে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গেলেন না এবং গ্রেফতার হলেন। কেন এই সিদ্ধান্ত? সেই কথা বলুন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, সে এক কাহিনি। তা বলা প্রয়োজন। সেই সন্ধ্যায় পাকিস্তান সামরিক জান্তার কমান্ডো বাহিনী আমার বাড়ি ঘেরাও করেছিল। ওরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। ওরা প্রথমে ভেবেছিল, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে আমাকে হত্যা করবে এবং প্রচার করে দেবে যে, আমার সঙ্গে রাজনৈতিক আপস আলোচনার মাঝখানে বাংলাদেশের চরমপন্থীরাই আমাকে হত্যা করেছে। আমি বেরুনো-না বেরুনো নিয়ে চিন্তা করলাম। আমি জানতাম, পাকিস্তানি বাহিনী বর্বর। আমি জানতাম, আমি আত্মগোপন করলে ওরা দেশের সব মানুষকেই হত্যা করবে। তাই স্থির করলাম, আমি মরি তাও ভালো, তবু আমার প্রিয় দেশবাসী রক্ষা পাক।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনি হয়তো কলকাতা চলে যেতে পারতেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ইচ্ছা করলে আমি যেকোনো জায়গায় যেতে পারতাম, কিন্তু আমার দেশবাসীকে পরিত্যাগ করে আমি কেমন করে যাব? আমি তাদের নেতা, আমি সংগ্রাম করব, মৃত্যুবরণ করব, পালিয়ে কেন যাব? দেশবাসীর কাছে আমার আহ্বান ছিল, তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোল।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনার সিদ্ধান্ত অবশ্যই ঠিক ছিল। কারণ, এ ঘটনাই বিগত নয় মাস ধরে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপনাকে তাদের বিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত করেছে। আপনি তো তাদের কাছে এখন প্রায় ঈশ্বরসম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমি তা বলি না। কিন্তু এ কথা সত্য তারা আমাকে ভালোবাসে। আমি আমার বাংলার মানুষকে ভালোবেসেছিলাম, তাদের জীবন রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হানাদার বর্বর বাহিনী আমাকে সেই রাতে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করল। ওরা আমার বাড়ি ধ্বংস করে দিল। আমার গ্রামের বাড়িতে যেখানে আমার ৯০ বছর বয়সী পিতা আর ৮০ বছরের মাতা ছিলেন, সেই বাড়িও ধ্বংস করে দিল। সৈন্য পাঠিয়ে বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে তাদের চোখের সামনে সেই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল, বাবা-মার আর কোনো আশ্রয় রইল না। ওরা সবকিছুই জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

আমি ভেবেছিলাম, আমাকে পেলে ওরা আমার হতভাগ্য মানুষদের হত্যা করবে না। আমি জানতাম, আমাদের সংগঠনের শক্তি আছে। আমি একটি শক্তিশালী সংগঠনকে জীবনব্যাপী গড়ে তুলেছিলাম, জনগণ যার ভিত্তি। আমি জানতাম, তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রতি ইঞ্চিতে তোমরা লড়াই করবে। আমি বলেছিলাম, হয়তো এটাই আমার শেষ নির্দেশ, কিন্তু মুক্তি অর্জন না করা পর্যন্ত তাদের লড়াই করতে হবে, লড়াই তাদের চালিয়ে যেতে হবে।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনাকে ঠিক কীভাবে ওরা গ্রেফতার করেছিল? তখন তো রাত দেড়টা, তাই নয় কি? তখন কী ঘটল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : প্রথমে ওরা আমার বাড়ির ওপর মেশিনগানের গুলি চালিয়েছিল।

ডেভিড ফ্রস্ট : ওরা যখন এলো তখন আপনি বাড়ির কোনখানে ছিলেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : এই যেটা দেখছেন, এটা আমার শোবার ঘর, আমি এই ঘরেই তখন বসেছিলাম। এদিক থেকেই ওরা মেশিনগান চালাতে আরম্ভ করে, এরপর এদিক-ওদিক সবদিক থেকেই গুলি ছুড়তে থাকে, জানালার ওপর গুলি চালায়।

ডেভিড ফ্রস্ট : এগুলো সব তখন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, সব ধ্বংস করেছিল, আমি তখন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ছিলাম, একটা গুলি আমার শোবার ঘরে এসে পড়ে। আমার ছয় বছরের ছোট ছেলেটি বিছানায় শোয়া ছিল, আমার স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে বসেছিলেন।

ডেভিড ফ্রস্ট : পাকিস্তান বাহিনী কোনদিক দিয়ে ঢুকেছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ৈসব দিক দিয়ে, ওরা এবার জানালার মধ্য দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আমি আমার স্ত্রীকে সন্তান দুটিকে নিয়ে বসে থাকতে বলি, এরপর সেখান থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে আসি।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনার স্ত্রী সেই সময় কিছু বলেছিলেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : না, তখন কোনো শব্দ উচ্চারণের অবস্থা ছিল না, আমি তাকে শুধু বিদায় সম্বোধন জানিয়েছিলাম। দুয়ার খুলে বাইরে এসে ওদের গুলি বন্ধ করতে বলেছিলাম। আমি বললাম, তোমরা গুলি বন্ধ করো। আমি তো এখানেই দাঁড়িয়ে আছি, গুলি করছ কেন? তোমরা কী চাও? তখন চারদিক থেকে ওরা বেয়নেট উঁচিয়ে ছুটে এলো, এক অফিসার আমাকে ধরে বলল, এই, ওকে মেরে ফেল না।

ডেভিড ফ্রস্ট : একজন অফিসারই ওদের থামিয়েছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, ওই অফিসারই ওদের থামিয়েছিল। ওরা তখন আমাকে এখান থেকে টেনে নামাল, পেছন থেকে আমার গায়ে, পায়ে, বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মারতে লাগল, অফিসারটা আমাকে ধরেছিল, তবু ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে, টেনে নামাতে লাগল। আমি বললাম, তোমরা আমাকে টানছ কেন? আমি তো যাচ্ছি। বললাম, আমার তামাকের পাইপটা নিতে দাও। ওরা থামল। আমি উপরে গিয়ে তামাকের পাইপটা নিয়ে এলাম। আমার স্ত্রী তখন ছেলে দুটিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমাকে কিছু কাপড়-চোপড়সহ ছোট একটি সুটকেস দিলেন। সেটা নিয়ে নেমে এলাম। চারদিকে দেখলাম আগুন জ্বলছে। আজ এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক এখান থেকে ওরা আমাকে নিয়ে গেল।

ডেভিড ফ্রস্ট : সেদিন যখন ৩২ নম্বরের আপনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন তখন কি ভেবেছিলেন আর কোনদিন আপনি এখানে ফিরে আসতে পারবেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : না, আমি সেটা কল্পনাও করিনি, মনে মনে ভেবেছি, এই শেষ। কিন্তু আমার মনের কথা ছিল আজ যদি আমার দেশের নেতা হিসেবে মাথা উঁচু রেখে মরতে পারি, তাহলে আমার দেশের মানুষের অন্তত লজ্জার কোনো কারণ থাকবে না। কিন্তু আমি আত্মসমর্পণ করলে আমার দেশবাসী পৃথিবীর সামনে আর মুখ তুলে তাকাতে পারবে না। আমি মরি, তাও ভালো, তবু আমার দেশবাসীর মর্যাদার যেন কোনো হানি না ঘটে।

ডেভিড ফ্রস্ট : শেখ সাহেব, আপনি একবার বলেছিলেন, ‘যে মানুষ একবার মরতে রাজি, তুমি তাকে মারতে পারো না।’ কথাটা কি এমনই ছিল না?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। যে মানুষ মরতে রাজি, তাকে কেউ মারতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন, সেটা তার দেহ, কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না, কেউ তা পারে না। এটা আমার বিশ্বাস। আমি মুসলমান, মুসলমান একবারই মাত্র মরে, দুবার নয়। আমি মানুষ, আমি মনুষ্যত্বকে ভালোবাসি। আমি আমার জাতির নেতা। আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি। আজ তাদের কাছে আমার আর কিছু দাবি নেই। তারা আমাকে ভালোবেসেছে, সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে। কারণ, আমি আমার সবকিছু তাদের দেয়ার অঙ্গীকার করেছি, আজ তাদের মুখে হাসি দেখতে চাই। যখন আমার প্রতি আমার দেশবাসীর স্নেহ ভালোবাসার কথা ভাবি, তখন আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই।

ডেভিড ফ্রস্ট : পাকিস্তানি বাহিনী আপনার বাড়ির সবকিছুই লুট করে নিয়েছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, আমার সবকিছুই ওরা লুট করেছে। বিছানাপত্র, আলমারি, কাপড়-চোপড় সবকিছুই লুট করেছে। মি. ফ্রস্ট, আপনি দেখতে পাচ্ছেন এ বাড়ির কোনো কিছুই আজ নেই।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনার বাড়ি যখন মেরামত হয় তখন এসব জিনিস লুণ্ঠিত হয়েছে না পাকিস্তানিরা সব লুণ্ঠন করেছে?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : পাকিস্তানি ফৌজ সবকিছুই লুণ্ঠন করেছে। কিন্তু এই বর্বর বাহিনী আমার আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, আমার সন্তানদের দ্রব্যসামগ্রী লুট করেছে তাতে আমার দুঃখ নেই, আমার দুঃখ ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল, একটা সুন্দর লাইব্রেরি ছিল, বর্বররা আমার প্রত্যেকটি বই আর এই মূল্যবান দলিলপত্র লুণ্ঠন করেছে। সবকিছুই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিয়ে গেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : তাই আবার সেই প্রশ্নটা আমাদের সামনে চলে আসে, কেন ওরা সবকিছু লুণ্ঠন করল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : এর কী জবাব দেব? আসলে ওরা মানুষ নয়, কতগুলো ঠগ, দস্যু, উন্মাদ, অমানুষ আর অসভ্য জানোয়ার। আমার নিজের কথা ছেড়ে দিন, তা নিয়ে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, দুই বছর, পাঁচ বছরের শিশু, মেয়েরা, কেউ রেহাই পেল না, সব নিরীহ মানুষদের ওরা হত্যা করেছে। আমি আপনাকে দেখিয়েছি জ্বালিয়ে দেয়া পোড়া বাড়ি, বস্তি দেখিয়েছি, একেবারে গরিব খেটে খাওয়া মানুষ বাস করত এখানে, এসব মানুষ জীবন নিয়ে পালাতে চেয়েছে, আর সেসব মানুষের ওপর চারদিক থেকে মেশিনগান চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : পাকিস্তানে বন্দি থাকাকালে ওরা আপনার বিচার করেছিল, সেই বিচার সম্পর্কে কিছু বলুন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান :
ওরা একটা কোর্ট মার্শাল তৈরি করেছিল। তাতে সাতজন ছিল সামরিক অফিসার। বাকি কয়েকজন বেসামরিক অফিসার।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনল ওরা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহিতা, পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র আরও কত কী।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন? আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উপায় ছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : সরকারের তরফ থেকে শুরুর দিকে এক উকিল দিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন দেখলাম অবস্থাটা এমনই যে যুক্তির কোনো দাম নেই। দেখলাম এ হচ্ছে বিচারের এক প্রহসনমাত্র। তখন আমি কোর্টে নিজে দাঁড়িয়ে বললাম, জনাব বিচারপতি দয়া করে আমাকে সমর্থনকারী উকিল সাহেবদের যেতে বলুন। আপনারা বিলক্ষণ জানেন এটা হচ্ছে গোপন বিচার। আমি বেসামরিক লোক, সামরিক কোনো লোক নই, আর এরা করছে আমার কোর্ট মার্শাল। ইয়াহিয়া খান কেবল যে প্রেসিডেন্ট তাই নয়, তিনি প্রধান সামরিক শাসকও। এই বিচারের রায়কে অনুমোদনের কর্তা তিনি। এই আদালত গঠন করেছেন তিনি।

ডেভিড ফ্রস্ট : তার মানে তার হাতেই ছিল সব…

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, সে ছিল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তার ইচ্ছাই ইচ্ছা।

ডেভিড ফ্রস্ট : তার মানে আপনি আদালতে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : তার কোনো উপায় ছিল না। আমি তো বন্দি।

ডেভিড ফ্রস্ট : হ্যাঁ, তা-তো বটেই। আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো উপায় ছিল না। ওরা কি বিচার শেষ করে সরকারিভাবে কোনো রায় তৈরি করেছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ৪ ডিসেম্বর (১৯৭১) ওরা আদালতের কাজ শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া খান সব বিচারক তথা লেফটেন্যান্ট, কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার; তাদের সবাইকে রাওয়ালপিন্ডি ডেকে পাঠল রায় তৈরির জন্য। সেখানে ঠিক করা হলো ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে।

ডেভিড ফ্রস্ট : তাই সেলের পাশে কবর খোঁড়া দেখে আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওরা ওখানেই আপনাকে কবর দেবে?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, আমার সেলের পাশেই ওরা কবর খুঁড়ল, আমার চোখের সামনে।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনি নিজের চোখে তাই দেখলেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, নিজের চোখে দেখলাম ওরা আমার কবর খুঁড়ছে। আমি নিজের কাছে নিজে বললাম, আমি জানি এই কবর আমার কবর। ঠিক আছে, কোনো পরোয়া নেই। আমি তৈরি আছি।

ডেভিড ফ্রস্ট : ওরা কি আপনাকে বলেছিল, এতো তোমার কবর?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : না, ওরা তা বলেনি।

ডেভিড ফ্রস্ট : কী বলেছিল ওরা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ওরা বলল- না না, তোমার কবর না। ধার যদি বম্বিং হয় তাহলে তুমি এখানে শেল্টার নিতে পারবে।

ডেভিড ফ্রস্ট : সেই সময় আপনার চিন্তায় কী ছিল? আপনি কি ওই নয় মাস নিজের মৃত্যুর কথা চিন্তা করেছেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমি জানতাম যেকোনো দিন ওরা আমায় শেষ করে দিতে পারে, কারণ ওরা অসভ্য, বর্বর।

ডেভিড ফ্রস্ট : এমন অবস্থায় আপনার সময় কেমন করে কাটত? আপনি কী প্রার্থনা করতেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : এমন অবস্থায় আমার নির্ভর ছিল আমার বিশ্বাস, আমার নীতি, পৌঁনে আট কোটি মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস। তারা আমায় ভালোবেসেছে, ভাইয়ের মতো, পিতার মতো। আমাকে তাদের নেতা বানিয়েছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : আপনি যখন দেখলেন ওরা কবর খুঁড়ছে, তখন আপনার মনে কার কথা আগে জাগল- আপনার দেশের কথা নাকি আপনার স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের কথা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমার প্রথম চিন্তা, আমার দেশের জন্য। আমার আত্মীয়-স্বজনের চাইতেও আমার ভালোবাসা আমার দেশের জন্য। আমার যা কিছু দুঃখ-ভোগ সেতো আমার দেশেরই জন্য। আপনি তো দেখেছেন, আমাকে তারা কী গভীরভাবে ভালোবাসে।

ডেভিড ফ্রস্ট : কিন্তু ওরা তো আপনাকে কবর দিতে পারেনি। সেদিন কে আপনাকে রক্ষা করেছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমার বিশ্বাস সর্বশক্তিমান আল্লাহ-ই আমাকে রক্ষা করেছিল।

ডেভিড ফ্রস্ট : আমি একটি বিবরণে দেখলাম, আপনাকে নাকি জেলার এক সময় সরিয়ে রেখেছিল। ইয়াহিয়া খান যখন আপনাকে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিল তখন আপনাকে স্থানান্তর করা হয়েছিল, এটা কি ঠিক?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ওরা জেলখানায় একটা অবস্থা তৈরি করেছিল; মনে হচ্ছিল কতগুলো কয়েদিকে ওরা সংগঠিত করেছিল যেন সকালে মিলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যা করতে পারে। আমার মনে হয়, আমাকে তত্ত্বাবধানের ভার যে অফিসারের ওপর পড়েছিল, আমার প্রতি তার কিছুটা সহানুভূতি জেগেছিল। হয়তো সেই অফিসার এমনও বুঝতে পেরেছিল যে, ইয়াহিয়া খানের দিন শেষ হয়ে আসছে। আমি দেখলাম হঠাৎ রাত ৩টার সময় সেই অফিসার এসে আমাকে সেল থেকে সরিয়ে নিয়ে তার নিজের বাংলোতে দুই দিন রেখেছিল। ওই দুই দিন আমার জন্য কোনো সামরিক পাহারা ছিল না। দুই দিন পর সেই অফিসার আমাকে অন্য একটি আবাসিক কলোনির নির্জন এলাকায় সরিয়ে নেয়। সেখানে আমাকে চার/পাঁচ কিংবা ছয় দিন রাখা হয়েছিল। ওই সময় আমার অবস্থান সম্পর্কে নিম্নপদস্থ কিছু অফিসার বাদে আর কেউ জানত না।

ডেভিড ফ্রস্ট : এমন কী শেষ মুহূর্তে ইয়াহিয়া খান যখন ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তখনও নাকি সে ভুট্টোর কাছে আপনার ফাঁসির কথা বলেছিল। এটা কি ঠিক?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ ঠিক, ভুট্টো আমাকে সেই কাহিনী বলেছিল। ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার সময় ইয়াহিয়া বলেছিল, মিস্টার ভুট্টো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি না দেয়া।

ডেভিড ফ্রস্ট : ইয়াহিয়া এমন কথা বলেছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, ভুট্টো এ কথা আমায় বলে আরও বলেছিল, ইয়াহিয়ার দাবি ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে সেই পেছনের তারিখ দিয়ে আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু ভুট্টো তার সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।

ডেভিড ফ্রস্ট : শেখ সাহেব, আজ যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ ঘটে তাহলে তাকে আপনি কী বলবেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ইয়াহিয়া খান একজন জঘন্য খুনি, তার ছবি দেখতেও আমি রাজি নই। তার বর্বর ফৌজ দিয়ে সে আমার ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ, এ কথা আপনি সঠিভাবে জানেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমার লোকজন তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসিনি। সংখ্যা হয়তো একেও (৩০ লাখ) ছাড়িয়ে যাবে। ৩০ লাখের কম তো নয়ই।

ডেভিড ফ্রস্ট : কিন্তু এমন হত্যাকাণ্ড তো নিরর্থক। মানুষকে ঘর থেকে টেনে এনে হত্যা করা…

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, ওরা কাদের হত্যা করেছে? একেবারে নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষকে, গ্রামের মানুষকে, যে মানুষ পৃথিবীর কথাই হয়তো কিছুই জানত না। সেই গ্রামে পাখি মারার মতো গুলি করে পাকিস্তানিরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : আমার মনেও প্রশ্ন, আহ্ কেন এমন হলো?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : না, আমিও জানি না, আমিও বুঝি না। পৃথিবীতে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে আমারও জানা নেই।

ডেভিড ফ্রস্ট :
এটা তো মুসলমানের হাতেই মুসলমান হত্যা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ওরা নিজেদের মুসলমান বলে? অথচ হত্যা করেছে মুসলমান মেয়েদের, আমরা অনেককে উদ্ধারের চেষ্টা করেছি, আমাদের ত্রাণ শিবিরে এখনও অনেকেই আছে। তাদের স্বামী, পিতা সকলকে হত্যা করা হয়েছে। মা আর বাবার সামনে ওরা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, পুত্রের সামনে মাকে ধর্ষণ করেছে। আপনি চিন্তা করুন? আমি একথা কল্পনা করে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না, এরা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে কিভাবে? এরা তো পশুর চেয়েও অধম। মনে করুন আমার বন্ধু মশিউর রহমানের কথা। আমাদের দলের একজন শীর্ষপর্যায়ের নেতা ছিলেন তিনি, সরকারের একজন প্রাক্তন মন্ত্রীও ছিলেন। তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ২৪ দিন ধরে তার ওপর নির্যাতন চলেছে, প্রথমে তার এক হাত কাটা হয়, এরপর আরেকটা, এরপর কেটেছে কান, তার পা কেটেছে; ২৪ দিন ধরে তার ওপর নির্যাতন চলেছে (এ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু কেঁদে দেন)। কিন্তু এটা একটিমাত্র ঘটনা নয়, আমাদের কত নেতা আর কর্মী, বুদ্ধিজীবী আর সরকারি কর্মচারীকে জেলখানায় আটক করে দিনের পর দিন অত্যাচার করে হত্যা করেছে। এমন অমানুষিক নির্যাতনের কাহিনী আমি ইতিহাসে কোথাও শুনিনি। একটা পশু, একটা বাঘও তো মানুষকে হত্যা করলে এমনভাবে করে না।

ডেভিড ফ্রস্ট : আমাদের আজকের এই আলাপে আপনি নেতা এবং নেতৃত্বের কথা তুলেছেন, আপনার কাছে যথার্থ নেতৃত্বের সংজ্ঞা কী?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমি বলব যথার্থ নেতৃত্ব আসে সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কেউ আকস্মিকভাবে একদিনে নেতা হতে পারে না, তাকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসতে হবে, মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হবে, তার আদর্শ থাকতে হবে, নীতি থাকতে হবে। এসব গুণ যার ভেতর থাকে সেই কেবল নেতা হতে পারে।

ডেভিড ফ্রস্ট : ইতিহাসের কোন নেতাদের আপনি স্মরণ করেন, প্রশংসা করেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : স্মরণীয় অনেকেই, বর্তমানের নেতাদের কথা বলছি না।

ডেভিড ফ্রস্ট : না, বর্তমানের কেউ নয়, কিন্তু ইতিহাসের কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : আমি আব্রাহাম লিংকনকে স্মরণ করি। স্মরণ করি মাও সেতুং, লেনিন, চার্চিলকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডিকেও আমি শ্রদ্ধা করতাম।

ডেভিড ফ্রস্ট : মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, নেতাজী সুভাষ বসু, সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক, কামাল আতাতুর্ক- তাদের জন্য আমার মনে গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামী নেতা ড. সুকর্ণকে শ্রদ্ধা করতাম। তারা সবাই তো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এসেছিলেন।

ডেভিড ফ্রস্ট : আজ এই মুহূর্তে, অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন বলে মনে করেন? কোন মুহূর্তটি আপনাকে সবচাইতে সুখী করেছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : যেদিন শুনলাম আমার বাংলাদেশ স্বাধীন, সেই দিনটিই ছিল সবচাইতে সুখের।

ডেভিড ফ্রস্ট : স্বাধীনতার সংগ্রামে আপনি কবে প্রথম কারাগারে যান?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জেলে গমন শুরু হয় বোধ হয় সেই ১৯৪৮ সালে। এরপর ১৯৪৯ সালে গ্রেফতার হয়ে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত জেলে থাকি। ১৯৫৪ সালে মন্ত্রী হই, আবার ১৯৫৪ সালেই গ্রেফতার হয়ে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত জেলে থাকি। আবার ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান আমাকে জেলে পাঠায়, তখন পাঁচ বছর আটক থাকি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ নানা মামলায় সরকার আমার বিচার করেছে। ১৯৬৬ সালে আবার আমাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিন বছর আটক রাখা হয়। এরপর ইয়াহিয়া খান গ্রেফতার করে। এমন দীর্ঘ সংগ্রাম শুধু আমার নয়, আমার বহু সহকর্মীর জীবনেই ঘটে একই ইতিহাস। (জাগো নিউজ)

ভিডিও দেখতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন…

নিউজ ডেস্ক
: আপডেট, বাংলাদেশ ১১ : ৪৫ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০১৭, মঙ্গলবার
এইউ

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ইলিশ উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা

নদ-নদীর ...